নির্ভীক বাংলা,পটাশপুর (পূর্ব মেদিনীপুর):
পঁচেট ৪ নং গ্রাম পঞ্চায়েতের উদ্যোগে ৪৫০ বছরের প্রাচীন পঁচেটগড় রাজবাড়িতে আয়োজিত হল এক মনোজ্ঞ শাস্ত্রীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। বহু বছর পর এই ঐতিহাসিক রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে শাস্ত্রীয় সংগীত ও নৃত্যের সুরে যেন জীবন্ত হয়ে উঠল তার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য।
পূর্ব মেদিনীপুর জেলার পটাশপুর–২ ব্লকের প্রাচীন পঁচেটগড় রাজবাড়িতে এই অনুষ্ঠান ঘিরে তৈরি হয় উৎসবের আবহ। রাজবাড়ির ঐতিহাসিক চত্বর ভরে ওঠে ধ্রুপদ, খেয়াল, শাস্ত্রীয় নৃত্য ও লোকনৃত্যের মুগ্ধকর পরিবেশনায়। জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত সংগীত ও নৃত্যশিল্পীরা তাঁদের প্রতিভা মেলে ধরেন মঞ্চে। শিল্পীদের পরিবেশনায় রাজবাড়ির প্রতিটি কোণ যেন সুরে সুরে প্রাণ ফিরে পায়।
এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এলাকার সাংস্কৃতিক প্রতিভাকে তুলে ধরা এবং দীর্ঘদিন ধরে হারিয়ে যেতে বসা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করাই ছিল মূল লক্ষ্য। বহু বছর পর রাজবাড়িতে এমন শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানের আয়োজনে খুশি স্থানীয় মানুষজন ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা।
পঁচেটগড় রাজবাড়ির সঙ্গে ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের রয়েছে গভীর ও ঐতিহাসিক যোগ। একসময় বিষ্ণুপুরের রাজার দরবার থেকে শাস্ত্রীয় সংগীত বিশেষজ্ঞ যদু ভট্ট এই রাজবাড়িতে আসেন। তাঁর হাত ধরেই পঁচেটগড় রাজবাড়িতে শাস্ত্রীয় সংগীতচর্চা ব্যাপক প্রসার লাভ করে। রাজবাড়ির এক সদস্য ছিলেন তৎকালীন ভারতের অন্যতম বিশিষ্ট সেতার বাদক। তাঁর ব্যবহৃত একটি বাদ্যযন্ত্র আজও ভারতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে—যা এই রাজবাড়ির গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।
ইতিহাস বলছে, পঁচেটগড় রাজবাড়ির মহাপাত্ররা একসময় ক্ষত্রিয় ছিলেন এবং যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন। পরবর্তীকালে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণের পর তাঁরা সংগীত, নাট্য ও সাংস্কৃতিক চর্চায় বিশেষভাবে মনোনিবেশ করেন। শাস্ত্রীয় সংগীতের পাশাপাশি লোকসংগীতও চর্চিত হত এই রাজবাড়িতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছিল।
সেই হারিয়ে যাওয়া সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে ফেরাতেই পঁচেট ৪ নং গ্রাম পঞ্চায়েত প্রশাসনের এই উদ্যোগ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অতিরিক্ত জেলা শাসক মানস মণ্ডল, পটাশপুর–২ সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিক শঙ্খ ঘটক, পঁচেট গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সুরজিৎ মাইতি, রাজ পরিবারের সদস্য সুনন্দন দাস মহাপাত্র-সহ বহু সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষজন।
এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে স্থানীয়দের বক্তব্য—এ ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ভবিষ্যতে নিয়মিত হলে এলাকার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে আরও সমৃদ্ধভাবে পৌঁছে যাবে।







