ভিডিও

বিলুপ্তির পথে সার্কাস: ফাঁকা আসন, ভেঙে পড়ছে শিল্পীদের মনোবল

আজন্তা সার্কাসে ২৫০ থেকে কমে ৭০ কর্মী

— নির্ভীক বাংলা, আসানসোল:

আসানসোল, ভারত — এক সময় সার্কাস ছিল বিনোদনের অন্যতম জনপ্রিয় মাধ্যম। গ্রাম থেকে শহর—যেখানেই সার্কাসের দল পৌঁছাত, সেখানেই উৎসবের আমেজ তৈরি হতো। রঙিন তাঁবু, ঝলমলে আলো, ঢাক-ঢোলের শব্দ আর শিল্পীদের রোমাঞ্চকর কসরত দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখত। সেই সময় সার্কাস মানেই ছিল ঠাসা ভিড়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র আমূল বদলে গেছে। আজ সার্কাস শিল্প অস্তিত্বের সংকটে ভুগছে। দর্শক কমে যাওয়ায় প্রায়ই দেখা যাচ্ছে ফাঁকা আসন। এই সংকট শুধু বিনোদনের নয়, দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও।
পশ্চিমবঙ্গের আসানসোলে চলা অজন্তা সার্কাস এই বাস্তবতারই এক জ্বলন্ত উদাহরণ। সার্কাসের ম্যানেজার মোল্লা সাদিক রহমান জানান, এক সময় এখানে প্রায় ২৫০ জন কর্মী কাজ করতেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৭০-এ। এর মধ্যে ৪০-৫০ জন শিল্পী মঞ্চে পারফর্ম করেন, বাকিরা অন্যান্য দায়িত্ব সামলান।
একসময় সার্কাসের মূল আকর্ষণ ছিল পশুদের খেলা—সিংহ, বাঘ, হাতি, ভালুক দর্শকদের টানত। কিন্তু পশু অধিকার সংক্রান্ত কঠোর আইন কার্যকর হওয়ার পর সার্কাসে প্রাণী প্রদর্শন নিষিদ্ধ হয়েছে। ফলে এই প্রাণীগুলোকে চিড়িয়াখানায় পাঠানো হয়েছে, আর এর ফলে সার্কাসের আকর্ষণ অনেকটাই কমে গেছে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
ডিজিটাল যুগও বড় প্রভাব ফেলেছে। মোবাইল, ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ও OTT প্ল্যাটফর্ম মানুষের বিনোদনের ধরন বদলে দিয়েছে। এখন ঘরে বসেই নানা ধরনের বিনোদন পাওয়া যায়, ফলে সার্কাসের প্রতি আগ্রহ কমছে।
অন্যদিকে, আর্থিক সংকট শিল্পটিকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। দর্শক কমে যাওয়ায় আয় কমছে, ফলে শিল্পীদের যথাযথ পারিশ্রমিক দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক সার্কাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার মুখে, আর যারা টিকে আছে তারা সীমিত সম্পদ নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্পীদের জীবনে। বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও এখন অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন পেশা পরিবর্তন করতে—কেউ ছোট ব্যবসায়, কেউ শ্রমিকের কাজে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প।
তবে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও দেখা যাচ্ছে। অনেক সার্কাস এখন পশু ছাড়াই আধুনিকভাবে শো উপস্থাপন করছে—মানব দক্ষতা, জিমন্যাস্টিকস, স্টান্ট ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু এখনও তা পর্যাপ্ত সাফল্য পায়নি।
সার্কাস সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি সহায়তা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলে এই শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সার্কাসকে যুক্ত করে নতুনভাবে উপস্থাপন করলে নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করা যেতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, সার্কাস শুধু বিনোদন নয়—এটি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সময় থাকতেই যদি একে বাঁচানোর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সার্কাস শুধুই গল্প হয়ে থাকবে।

TAGS

সম্পর্কিত খবর

সর্বশেষ খবর