নির্ভীক বাংলা,আসানসোল, পশ্চিম বর্ধমান জেলার মাইথন বাঁধের কাছে বরাকর নদীর তীরে অবস্থিত মা কল্যাণেশ্বরী মন্দির পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ শক্তিপীঠ হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১২০০ বছরের পুরোনো এই মন্দিরকে ঘিরে রয়েছে অগাধ ভক্তি, বিশ্বাস এবং একাধিক রহস্যময় জনশ্রুতি। প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত তাঁদের মনোস্কামনা পূরণের আশায় এখানে আসেন। এই মন্দিরের বিশেষত্ব হল, এখানে কোনও দেবদেবীর মূর্তি নেই; একটি পবিত্র শিলাকেই মা কল্যাণেশ্বরীর রূপ হিসেবে পূজা করা হয়। প্রচলিত বিশ্বাস, এই শিলার নিচে একটি অদৃশ্য গুহা রয়েছে এবং শিলার ছোট্ট একটি ছিদ্র স্পর্শ করলেই মায়ের আশীর্বাদ লাভ হয়।
রাজা বল্লাল সেন ও কাপালিক সাধকের ইতিহাস
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, দ্বাদশ শতকে কাপালিক সাধক দেবদাস চট্টোপাধ্যায় মা কালীর সাধনার উদ্দেশ্যে এই অঞ্চলের ঘন জঙ্গলে আসেন। তখন পুরো এলাকাই ছিল অরণ্যে ঘেরা। জনশ্রুতি, বাংলার রাজা বল্লাল সেন ওই সাধকের ভক্ত ছিলেন। তাঁর পরামর্শে রাজা বর্তমান শবনপুর (শ্রবণপুর) গ্রামে দেবী শ্যামারূপার মন্দির নির্মাণ করেন। পরে সেখানে জনবসতি বাড়তে শুরু করলে দেবী বর্তমান কল্যাণেশ্বরী স্থানে অধিষ্ঠিত হন। সেই থেকেই এখানে মা কল্যাণেশ্বরীর আরাধনা শুরু হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, “মাইথন” নামটিও এসেছে “মায়ের থান” শব্দ থেকে।
মূর্তি নয়, শিলারূপেই পূজিতা মা
মা কল্যাণেশ্বরী মন্দিরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল এখানে কোনও প্রতিমার পূজা হয় না। মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত একটি বিশাল শিলাকেই দেবীর রূপ হিসেবে মানা হয়। শিলার এক কোণে থাকা ছোট্ট একটি ছিদ্র স্পর্শ করে ভক্তরা মায়ের আশীর্বাদ লাভের বিশ্বাসে প্রণাম করেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই প্রথা আজও অব্যাহত রয়েছে।
রাজা কল্যাণীপ্রসাদের জনশ্রুতি
আরও একটি প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, রাজা বল্লাল সেনের পালিতা কন্যা লক্ষ্মীর বিয়ে হয় কাশীপুরের রাজা কল্যাণীপ্রসাদের সঙ্গে। বিয়ের সময় দেবী শ্যামারূপার বিগ্রহ তাঁদের উপহার হিসেবে দেওয়া হয়। ফেরার পথে জঙ্গলের মধ্যে পথ হারিয়ে তাঁরা বিগ্রহটি একটি স্থানে রেখে দেন। পরদিন সেটি আর সরানো সম্ভব হয়নি। এটিকে দেবীর ইচ্ছা বলে মনে করে সেই স্থানেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে রাজা কল্যাণীপ্রসাদের নাম অনুসারেই দেবীর নাম হয় মা কল্যাণেশ্বরী।
রহস্যময় নববধূ ও শাঁখারির কাহিনি
মন্দিরকে ঘিরে সবচেয়ে জনপ্রিয় জনশ্রুতিগুলির মধ্যে রয়েছে এক রহস্যময় নববধূর গল্প। বলা হয়, একদিন বরাকর নদীর ঘাটে এক নববধূ শাঁখা পরতে আসেন। শাঁখারি দাম চাইলে তিনি বলেন, শবনপুরে তাঁর বাবা দেবনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিতে।
শাঁখারি সেখানে পৌঁছে জানতে পারেন, দেবনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কোনও কন্যাই নেই। পরে দু’জনে নদীর ঘাটে ফিরে এসে দেখেন, সেখানে কোনও নববধূ নেই। কেবল একটি পাথরের ওপর এক নারীর পায়ের ছাপ দেখা যায়। এটিকে দেবীর অলৌকিক লীলা বলে বিশ্বাস করা হয়। পরবর্তীতে সেই স্থানেই মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেবনাথ চট্টোপাধ্যায় হন প্রথম সেবায়েত।
সন্তান লাভের আশায় ভক্তদের ভিড়
মা কল্যাণেশ্বরীর দরবারে সবচেয়ে বেশি ভক্ত আসেন সন্তান লাভের মনোস্কামনা নিয়ে। স্থানীয় বিশ্বাস, নিষ্ঠার সঙ্গে পূজা ও মানত করলে নিঃসন্তান দম্পতিরা সন্তানের আশীর্বাদ লাভ করেন। এই বিশ্বাসে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য ভক্ত এখানে দর্শনে আসেন।
মঙ্গলবার ও শনিবার উপচে পড়ে ভিড়
প্রতিদিনই মন্দিরে নিয়মিত পূজা হয়। তবে মঙ্গলবার ও শনিবার বিশেষ পূজার আয়োজন করা হয়। এছাড়া কালীপুজো ও দুর্গাপুজোর সময় এখানে বিশাল ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন হয় এবং হাজার হাজার ভক্তের সমাগম ঘটে।
কোথায় অবস্থিত এই মন্দির
মা কল্যাণেশ্বরী মন্দির পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম বর্ধমান জেলার মাইথন বাঁধের কাছে বরাকর নদীর তীরে অবস্থিত। এটি পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের সীমানার একেবারে নিকটে। আসানসোল থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার এবং বরাকর রেলস্টেশন থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় তীর্থস্থান।




