ভিডিও

আসানসোল বাসস্ট্যান্ডে ‘ডেভেলপমেন্ট ফি’ ঘিরে তুমুল বিতর্ক

তৃণমূল শ্রমিক নেতা তুললেন কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ, বিজেপি বিধায়কের হুঁশিয়ারি— “কাটমানি ও সিন্ডিকেট রাজ আর চলবে না”

নির্ভীক বাংলা,আসানসোল, পশ্চিমবঙ্গ: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের ভরাডুবি এবং বিজেপির বিপুল জয়ের পর এবার আসানসোল বাসস্ট্যান্ডে দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা তথাকথিত “ডেভেলপমেন্ট ফি” আদায়কে ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। তৃণমূল ঘনিষ্ঠ শ্রমিক নেতা রাজু আহলুওয়ালিয়া অভিযোগ তুলেছেন যে আসানসোল পুরনিগমের নামে বাস থেকে প্রতিদিন ১০ থেকে ২০ টাকা করে আদায় করা হলেও সেই অর্থের পূর্ণ হিসাব পুরনিগমে জমা পড়ে না। তিনি এই পুরো ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
রাজু আহলুওয়ালিয়ার দাবি, “রক্ষণাবেক্ষণ ও ডেভেলপমেন্ট”-এর নামে বহু বছর ধরে এই টাকা তোলা হচ্ছে, কিন্তু সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে তার কোনও স্বচ্ছ হিসাব নেই। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি নতুন নয়; প্রাক্তন মেয়র তাপস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলেও এই নিয়ে অভিযোগ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ হয়েছিল।
২০১৪ সালের চিঠি ঘিরে ফের উত্তাপ
রাজু আহলুওয়ালিয়া ২০১৪ সালের ১৬ মার্চ তৎকালীন মেয়র তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক আসানসোল দক্ষিণ থানার ওসিকে পাঠানো একটি চিঠির উল্লেখ করে বলেন, সেই সময়ও বাসস্ট্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। ওই চিঠি অনুযায়ী, ইসমাইল এলাকার বাসিন্দা অশীম মিত্র ওরফে “বাচ্চু”-কে আসানসোল বাস অ্যাসোসিয়েশনের সুপারিশে প্রতিটি বাস থেকে প্রতিদিন ৫ টাকা করে ডেভেলপমেন্ট ফি তোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগ, ১ আগস্ট ২০০৯ থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত মোট ২৬ লক্ষ ৪০ হাজার টাকা আদায় হলেও পুরনিগমের খাতে জমা পড়ে মাত্র ৮ লক্ষ ৩৯ হাজার ৩৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ১৮ লক্ষ টাকারও বেশি অর্থ জমা হয়নি বলে অভিযোগ। পুরনিগম একাধিকবার নোটিস পাঠিয়েও টাকা উদ্ধার করতে না পারায় পুলিশের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছিল।
RTI-তে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
রাজু আহলুওয়ালিয়া তথ্যের অধিকার আইন (RTI) অনুযায়ী আসানসোল পুরনিগমের জন তথ্য আধিকারিকের কাছে আবেদন করে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি জানতে চেয়েছেন, কোন নিয়ম বা সরকারি নির্দেশের ভিত্তিতে কোনও ব্যক্তিকে সরকারি বাসস্ট্যান্ড থেকে টাকা তোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া এখন পর্যন্ত মোট কত টাকা আদায় হয়েছে, পুরনিগমে কত জমা পড়েছে এবং কত বকেয়া রয়েছে, সেই তথ্যও চাওয়া হয়েছে। সরকারি রসিদ দেওয়া হতো কি না এবং রাজস্ব ক্ষতি হয়ে থাকলে তার জন্য দায়ী কে— সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে।
রাজুর অভিযোগ, আসানসোল পুরনিগম কোনও স্বচ্ছ টেন্ডার প্রক্রিয়া ছাড়াই নিজেদের পছন্দের লোকদের দায়িত্ব দেয় এবং পরে তারাই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। তিনি দাবি করেন, যাঁর বিরুদ্ধে আগে অভিযোগ উঠেছিল তিনি গ্রেফতারও হয়েছিলেন, কিন্তু তারপরও দুর্নীতি বন্ধ হয়নি।
“বিজেপি সরকারের আমলে সিন্ডিকেট রাজ চলবে না”
এই বিতর্কে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন আসানসোল উত্তর কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ও। তিনি বলেন, বিজেপি সরকারের আমলে কোনও ধরনের “কাটমানি”, সিন্ডিকেট বা দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না। পুরনিগমের নামে যদি বেআইনি টাকা তোলা হয়ে থাকে, তাহলে তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
বিধায়কের এই মন্তব্য এবং শ্রমিক নেতার অভিযোগের পর বাসস্ট্যান্ডে টাকা তোলার সঙ্গে যুক্ত চক্রের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে খবর।
প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা তোলার অভিযোগ
তথ্য অনুযায়ী, আসানসোল বাসস্ট্যান্ডে প্রায় ৩৫০টি মিনিবাস এবং ২৫০টি বড় বাস চলাচল করে। প্রতিটি বাস থেকে যদি প্রতিদিন ১০ টাকা করে নেওয়া হয়, তাহলে দৈনিক আদায় দাঁড়ায় প্রায় ৬,৫০০ টাকা। আর ২০ টাকা করে নিলে সেই অঙ্ক ১৩ হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলে মাস ও বছরে এই আদায়ের পরিমাণ লক্ষাধিক টাকায় পৌঁছতে পারে।
রাজু আহলুওয়ালিয়া প্রশ্ন তুলেছেন, পুরনিগমের নামে টাকা তোলা হলেও যদি তা জমা না পড়ে, তাহলে সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, বহুবার লিখিত অভিযোগ করা হলেও প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি, ফলে অভিযুক্তদের মনোবল আরও বেড়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, অনেক বাসচালক ভয়ে মুখ খুলতে চান না। কেউ প্রতিবাদ করলেই সিন্ডিকেটের লোকেরা দুর্ব্যবহার এমনকি মারধর পর্যন্ত করে বলে অভিযোগ।
যাত্রী পরিষেবার বেহাল দশা নিয়েও প্রশ্ন
রাজু আহলুওয়ালিয়া বলেন, যদি এই অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা হতো, তাহলে আজ বাসস্ট্যান্ডে যাত্রীদের জন্য ভালো পানীয় জল, পরিষ্কার প্রতীক্ষালয়, শৌচালয় ও অন্যান্য পরিষেবা থাকত। কিন্তু বাস্তবে যাত্রী পরিষেবার অবস্থা অত্যন্ত খারাপ।
তাঁর দাবি, পুরো ঘটনার উচ্চস্তরের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন এবং ডেভেলপমেন্টের নামে আদায় করা টাকা কোথায় খরচ হয়েছে, তা জনসমক্ষে আনা উচিত।
এখন দেখার বিষয়, বিজেপি সরকার ও জেলা প্রশাসন এই অভিযোগের ভিত্তিতে কী পদক্ষেপ নেয় এবং দীর্ঘদিন ধরে ওঠা এই অভিযোগগুলির নিরপেক্ষ তদন্ত আদৌ হয় কি না।

TAGS

সম্পর্কিত খবর