নির্ভীক বাংলা,আসানসোল, পশ্চিম বর্ধমান আসানসোলের রাহা লেনে বুলডোজার অভিযানকে ঘিরে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক আরও তীব্র হয়েছে। রাস্তার ধারে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসা হকারদের উচ্ছেদের পর এবার রাজ্যের নগর উন্নয়ন ও পুর বিষয়ক মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বড়সড় ইউ-টার্ন নিয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন, ৯ জুলাই ‘মুখোমুখি’ কর্মসূচির প্রশাসনিক বৈঠকে শুধুমাত্র ১৫ দিনের নোটিস দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তাঁর দাবি, সেদিনই নোটিসও জারি করা হয়। কিন্তু তার পরের দিনই তাঁর অনুমতি ছাড়াই এবং নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই কয়েকজন আধিকারিক বুলডোজার চালিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালান।
মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানান, ৯ জুলাই আসানসোল পুরনিগমে অনুষ্ঠিত ‘মুখোমুখি’ কর্মসূচিতে তিনি সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনেন। এরপর পুর প্রশাসন, অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ও কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে শহরকে আরও সুসংগঠিত ও সুন্দর করে তোলার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। সেই বৈঠকেই জিটি রোডের ধারে ট্রান্সফরমারের নিচে গ্যাস সিলিন্ডার রেখে দোকান চালানো, প্লাস্টিক ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ দোকান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। তিনি আধিকারিকদের নির্দেশ দেন, আগে সংশ্লিষ্ট হকারদের ১৫ দিনের নোটিস দিয়ে স্বেচ্ছায় দোকান সরানোর সুযোগ দিতে।
মন্ত্রী অভিযোগ করেন, তা সত্ত্বেও ১০ জুলাই কয়েকজন আধিকারিক তাঁর অনুমতি ছাড়াই এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বুলডোজার অভিযান চালান। তিনি গোটা ঘটনাকে ‘মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং’ বলে উল্লেখ করে জানান, সংশ্লিষ্ট তিনজন আধিকারিককে অবিলম্বে শোকজ নোটিস পাঠানো হয়েছে। সন্তোষজনক জবাব না পেলে তাঁদের সাসপেন্ড করা হবে। পাশাপাশি যেসব হকারের দোকান নোটিস ছাড়াই ভেঙে ফেলা হয়েছে, তাঁদের দায়িত্ব সরকার নেবে এবং বিকল্প অস্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে।
মন্ত্রী জানান, বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন পাটোলা মার্কেটে অস্থায়ী দোকান তৈরি করে ক্ষতিগ্রস্ত হকারদের বসার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি গির্জামোড়-সহ বিভিন্ন এলাকায় স্থায়ী হকার মার্কেট গড়ে তোলার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। প্রথমে পুরনো ও প্রকৃত হকারদের সমীক্ষা করে তাঁদেরই পুনর্বাসনের সুবিধা দেওয়া হবে।
তিনি আরও ঘোষণা করেন, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশ অনুযায়ী দুর্গাপুজো পর্যন্ত শহরের ভিতরের ফুটপাথে বসা হকারদের বিরুদ্ধে কোনও উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে না। তবে রাস্তার একেবারে ধারে, যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে বা নিরাপত্তার ঝুঁকি তৈরি করছে—এমন দখলদারদের সোমবার থেকে ১৫ দিনের নোটিস দেওয়া হবে। বড় শোরুম ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলিকেও ছাড় দেওয়া হবে না। ফুটপাথে ফ্রিজ, টিভি, অন্যান্য সামগ্রী, শেড বা রান্নার ব্যবস্থা করে দখল করে রাখা বড় দোকানগুলিকেও নোটিস দিয়ে দখলমুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হবে।
মন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধুমাত্র উচ্ছেদ নয়, বরং গোটা আসানসোলের আধুনিক টাউন প্ল্যানিং করা। নতুন টাউনশিপ গড়ে তুলে সেখানে পরিকল্পিতভাবে হকারদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিক্স ও মুদি বাজারের মতো পৃথক ক্যাটাগরির মার্কেট তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে শহর যেমন সুন্দর হয়, তেমনই হকারদের জীবিকাও সুরক্ষিত থাকে।
এদিকে, রাহা লেনে বুলডোজার অভিযানের প্রতিবাদে পশ্চিম বর্ধমান আসানসোল হকার কমিটির ব্যানারে লাগাতার বিক্ষোভ চলছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী। এই অবস্থায় ঘটনাস্থলে পৌঁছে আন্দোলনরত হকারদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের শান্ত করেন আসানসোল উত্তর কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখার্জি।
বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখার্জি অভিযোগ করেন, পুরো বুলডোজার অভিযানটি ভুল পদ্ধতিতে করা হয়েছে। তাঁর দাবি, পুরনিগমের কয়েকজন তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ আধিকারিক পরিকল্পিতভাবে বিজেপি সরকার এবং মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার উদ্দেশ্যে অনুমতি ছাড়াই এই অভিযান চালিয়েছেন। তিনি এই ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে আসানসোল সাউথ থানায় এফআইআর দায়ের করেছেন এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
রাহা লেনের বুলডোজার অভিযান এখন আর শুধু উচ্ছেদ অভিযান নয়, বরং প্রশাসনিক জবাবদিহি ও রাজনৈতিক তরজার অন্যতম বড় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। একদিকে মন্ত্রী নোটিস ছাড়া হওয়া অভিযানের জন্য আধিকারিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, অন্যদিকে বিজেপি বিধায়ক ঘটনাটিকে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করে আইনি লড়াই শুরু করেছেন। এখন নজর শোকজ নোটিসের পর সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয় এবং হকারদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা কীভাবে বাস্তবায়িত হয়।





