ভিডিও

সুবেন্দু সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে বদল স্কুলের প্রার্থনা সভা, ‘বাংলার মাটি বাংলার জল’-এর বদলে এবার গাওয়া হচ্ছে ‘বন্দে মাতরম্’

সরকারি স্কুলে বাধ্যতামূলক ‘বন্দে মাতরম্’, ছাত্র-শিক্ষকদের মধ্যে দেশাত্মবোধের উচ্ছ্বাস


আসানসোল, পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন বিজেপি সরকার শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় ঘিরে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার এবার রাজ্যের সমস্ত সরকারি ও সরকার অনুমোদিত স্কুলে প্রার্থনা সভার সময় জাতীয় গান “বন্দে মাতরম্” গাওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে প্রতিদিন সকালে শোনা যাচ্ছে “বন্দে মাতরম্”-এর ধ্বনি।
আসানসোলের বিভিন্ন সরকারি ও সরকার অনুমোদিত স্কুলেও এখন প্রতিদিন সকালে জাতীয় গান “বন্দে মাতরম্” গাওয়া হচ্ছে। শুধু ছাত্রছাত্রীরাই নয়, শিক্ষকদের মধ্যেও এই গানকে ঘিরে দেশাত্মবোধের আবেগ ও উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
এর আগে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত “বাংলার মাটি বাংলার জল” গানটি স্কুলের প্রার্থনা সভায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। ১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ এই গান রচনা করেছিলেন। গানটির মাধ্যমে হিন্দু-মুসলিম বাঙালিদের ঐক্য ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা তুলে ধরা হয়েছিল।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার “বাংলার মাটি বাংলার জল”-কে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি “রাজ্য সঙ্গীত” হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর বহু সরকারি ও সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুলে প্রতিদিন এই গান গাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়।
তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর এবং শুভেন্দু অধিকারীর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর রাজ্যের একাধিক নীতিতে পরিবর্তন আনা শুরু হয়েছে। সেই পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই এবার স্কুলের প্রার্থনা সভায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত “বন্দে মাতরম্” বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনা আরও শক্তিশালী করা। তাঁর কথায়, “বন্দে মাতরম্ শুধু একটি গান নয়, এটি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের আত্মা। এই গান আমাদের সেই সমস্ত শহিদদের কথা মনে করিয়ে দেয়, যাঁদের আত্মত্যাগের ফলেই আজ দেশ স্বাধীন।”
রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর বহু স্কুলে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের মধ্যে উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। ছাত্রছাত্রীদের দাবি, “বন্দে মাতরম্” গাওয়ার মাধ্যমে দেশের প্রতি গর্ব ও সম্মানের অনুভূতি আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এক ছাত্র জানায়, “স্কুলে বন্দে মাতরম্ গাইতে পেরে আমরা গর্বিত। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এই গান গেয়েই বিপ্লবীরা দেশকে স্বাধীন করার লড়াই করেছিলেন। গানটি গাইলে মন ভরে যায় দেশপ্রেমে।”
শিক্ষকরাও মনে করছেন, জাতীয় গান অনেক আগেই স্কুলে বাধ্যতামূলক করা উচিত ছিল। তাঁদের মতে, “বন্দে মাতরম্” ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে শৃঙ্খলা, জাতীয় চেতনা ও দেশসেবার মানসিকতা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।
এক শিক্ষক বলেন, “ছাত্রছাত্রীরা যখন বন্দে মাতরম্ গায়, তখন তাদের মধ্যে এক আলাদা উদ্দীপনা দেখা যায়। মনে হয় গানটি ওদের দেশের জন্য কিছু করার অনুপ্রেরণা দিচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরিত্র গঠনে এই গান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।”
ইতিহাসে “বন্দে মাতরম্”-এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’-এ গানটি অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। পরবর্তীকালে এটি স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান স্লোগানে পরিণত হয়।
১৮৯৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর কলকাতায় ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনে প্রথমবার “বন্দে মাতরম্” গানটি গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এরপর থেকেই গানটি স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে “বন্দে মাতরম্” লক্ষ লক্ষ মানুষকে একত্রিত করেছিল। লালা লাজপত রায় “বন্দে মাতরম্” নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। আবার ১৯০৭ সালে জার্মানির স্টুটগার্টে ভিকাজি কামা যে ভারতের প্রথম তিরঙ্গা উত্তোলন করেছিলেন, তার মাঝের অংশে লেখা ছিল “বন্দে মাতরম্”।
ইতিহাসবিদদের মতে, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় হাজার হাজার বিপ্লবী “বন্দে মাতরম্” ধ্বনি তুলে আত্মবলিদান দেন। বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামী মাতঙ্গিনী হাজরার শেষ শব্দও ছিল “বন্দে মাতরম্”।
তবে এই গানকে ঘিরে অতীতেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রথম দুটি স্তবকে মাতৃভূমির বর্ণনা থাকলেও পরবর্তী অংশে দেবী দুর্গা ও লক্ষ্মীর উল্লেখ থাকায় কিছু মুসলিম সংগঠন আপত্তি জানিয়েছিল।
১৯৩৭ সালে কংগ্রেস সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসু এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ মত দেন যে, পরবর্তী স্তবকে দেবী বন্দনার বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ায় সর্বসমাজের গ্রহণযোগ্যতার জন্য প্রথম দুটি স্তবকই উপযুক্ত।
পরে মহাত্মা গান্ধী ও জওহরলাল নেহরুর সমর্থনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস সরকারি অনুষ্ঠানে শুধুমাত্র প্রথম দুটি স্তবক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদ “বন্দে মাতরম্”-কে ভারতের জাতীয় গানের মর্যাদা দেয়। সেই সময় গণপরিষদের সভাপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ঘোষণা করেন যে “জন গণ মন” জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে থাকবে এবং “বন্দে মাতরম্” সমান মর্যাদাসম্পন্ন জাতীয় গান হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।
২০২৬ সালের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী “বন্দে মাতরম্”-এর ১৫০ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মসূচিতে গানটির পূর্ণ ছয় স্তবকের সংস্করণ ব্যবহারের পক্ষে মত প্রকাশ করেন।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের এই সিদ্ধান্ত ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। বিজেপি একে জাতীয়তাবাদ ও সাংস্কৃতিক গৌরবের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিরোধীরা শিক্ষাক্ষেত্রের রাজনৈতিকরণের অভিযোগ তুলছে।
তবে আপাতত রাজ্যের বিভিন্ন স্কুলে প্রতিদিন সকালে “বন্দে মাতরম্”-এর সুরে মুখরিত হচ্ছে প্রার্থনা সভা এবং রাজ্য সরকার একে নতুন প্রজন্মের মধ্যে জাতীয় চেতনা জাগ্রত করার গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে দাবি করছে।

TAGS

সম্পর্কিত খবর