নির্ভীক বাংলা,গুয়াহাটি, :দেশের অন্যতম রহস্যময় ও শক্তিশালী তীর্থক্ষেত্র মা কামাখ্যা ধামে অনুষ্ঠিত অম্বুবাচী মেলা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি নারীশক্তি, সৃষ্টিশীলতা এবং প্রকৃতির উর্বরতার এক অনন্য উদযাপন। অসমের গুয়াহাটির নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দিরে প্রতিবছর জুন মাসে এই চারদিনব্যাপী মহোৎসব অনুষ্ঠিত হয়। দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্ত, সাধু-সন্ন্যাসী, অঘোরী ও তান্ত্রিক এই মেলায় অংশ নেন।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময়ে মা কামাখ্যা বার্ষিক রজস্বলা (মাসিক ঋতুচক্র) অবস্থায় থাকেন। তাই টানা তিন দিন মন্দিরের দরজা বন্ধ থাকে এবং পূজা-অর্চনা, দর্শন ও অন্যান্য শুভকাজ স্থগিত রাখা হয়। চতুর্থ দিনে বিশেষ স্নান ও পূজার পর মন্দিরের দ্বার পুনরায় ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
নারীশক্তি ও সৃষ্টির প্রতীক অম্বুবাচী
অম্বুবাচী উৎসবকে দেবীশক্তি ও সৃষ্টির শক্তির মহোৎসব হিসেবে দেখা হয়। হিন্দু দর্শনে নারীকে সৃষ্টির মূল শক্তি হিসেবে মান্য করা হয় এবং কামাখ্যা ধাম সেই আদ্যাশক্তির প্রতীক। তাই এই উৎসব কেবল ধর্মীয় নয়, প্রকৃতি ও জীবনের চক্রকে সম্মান জানানোরও এক অনন্য উপলক্ষ।
এই তিন দিন মন্দির প্রাঙ্গণে বিশেষ নিয়ম পালন করা হয়। দেবীর পূজা বন্ধ থাকে এবং গর্ভগৃহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখা হয়। ভক্তরা মন্দিরের বাইরে থেকে জপ, ধ্যান ও সাধনায় নিমগ্ন থাকেন।
৫১ শক্তিপীঠের মধ্যে অন্যতম প্রধান
পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, কামাখ্যা মন্দির ৫১টি শক্তিপীঠের অন্যতম প্রধান পীঠ। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেবী সতী ও ভগবান শিবের অমর কাহিনি।
কথিত আছে, রাজা দক্ষের যজ্ঞে অপমানিত হয়ে দেবী সতী আত্মাহুতি দেন। শোকে উন্মত্ত হয়ে ভগবান শিব সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব শুরু করেন। তখন সৃষ্টিকে রক্ষার জন্য ভগবান বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহ খণ্ডিত করেন। যেখানে যেখানে সতীর অঙ্গ বা অলংকার পতিত হয়, সেখানে সেখানে শক্তিপীঠ প্রতিষ্ঠিত হয়।
বিশ্বাস করা হয়, কামাখ্যা ধামে দেবী সতীর যোনি পতিত হয়েছিল। তাই এই স্থানকে সৃষ্টিশক্তি, মাতৃত্ব ও জীবনের উৎস হিসেবে বিশেষভাবে পূজা করা হয়।
যেখানে নেই দেবীর কোনো মূর্তি
কামাখ্যা মন্দিরের অন্যতম বিশেষত্ব হলো এখানে দেবীর কোনো প্রতিমা নেই। গর্ভগৃহে একটি প্রাকৃতিক শিলাখণ্ড ও জলধারা রয়েছে, যা যোনিকুণ্ড হিসেবে পূজিত হয়। ভূগর্ভস্থ গুহায় অবস্থিত এই পবিত্র জলকুণ্ড সর্বদা জলে পূর্ণ থাকে এবং ভক্তরা এই স্বরূপেরই দর্শন করেন।
অম্বুবাচীর সময় এই স্থানে একটি সাদা কাপড় অর্পণ করা হয়। তিন দিন পর মন্দিরের দরজা খোলার সময় সেই কাপড় লাল রঙ ধারণ করেছে বলে বিশ্বাস করা হয়। এই পবিত্র কাপড়কে ‘অম্বুবাচী বস্ত্র’ বা ‘রক্তবস্ত্র’ বলা হয় এবং তা প্রসাদ হিসেবে ভক্তদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
তন্ত্রসাধনার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র
কামাখ্যা ধামকে ভারতের তন্ত্রসাধনার রাজধানী বলেও অভিহিত করা হয়। অম্বুবাচী মেলার সময় দেশজুড়ে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অঘোরী, তান্ত্রিক, নাগা সাধু ও নানা সম্প্রদায়ের সাধক এখানে সমবেত হন।
দিনের বেলায় এলাকা ভক্তি ও আস্থায় মুখর থাকলেও, রাতের সময় বহু সাধক বিশেষ তান্ত্রিক সাধনা ও গূঢ় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেন। মন্দির সংলগ্ন গুহা ও নির্জন স্থানে বহু সাধক সিদ্ধিলাভ ও আধ্যাত্মিক উন্নতির উদ্দেশ্যে তপস্যা করেন। সেই কারণেই অম্বুবাচী মেলাকে তন্ত্রসাধনার ‘মহাকুম্ভ’ বলা হয়।
রহস্যে ঘেরা কামাখ্যা ধাম
স্থানীয় লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, অম্বুবাচীর সময় আশপাশের কিছু জলধারায় লালচে আভা দেখা যায়। যদিও এ বিষয়ে বিভিন্ন মত ও ব্যাখ্যা রয়েছে, তবুও এটি দীর্ঘদিন ধরে মানুষের আস্থা ও কৌতূহলের বিষয় হয়ে রয়েছে।
মন্দিরের দেয়ালে ৬৪ যোগিনী এবং দেবীর বিভিন্ন শক্তিরূপের অসাধারণ ভাস্কর্য ও অলঙ্করণ রয়েছে, যা এর প্রাচীন তান্ত্রিক ঐতিহ্য ও স্থাপত্যশৈলীর সাক্ষ্য বহন করে।
আস্থা, শক্তি ও সংস্কৃতির মিলনক্ষেত্র
অম্বুবাচী মেলা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি ভারতীয় সংস্কৃতিতে নারীশক্তির মর্যাদা, প্রকৃতির চক্রের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আধ্যাত্মিক সাধনার এক অনন্য মিলনক্ষেত্র।
প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত মা কামাখ্যার আশীর্বাদ লাভের উদ্দেশ্যে এখানে সমবেত হন। নীলাচল পাহাড়ে অবস্থিত এই শক্তিপীঠ আজও রহস্য, ভক্তি ও দিব্যশক্তির এমন এক কেন্দ্র, যা অসংখ্য মানুষের বিশ্বাস ও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে আছে।
মা কামাখ্যার ভক্তদের কাছে অম্বুবাচী মেলা শুধুমাত্র একটি উৎসব নয়, বরং শক্তি, সাধনা এবং আত্মিক উপলব্ধির এক অনন্য মহোৎসব।




