আসানসোল, ৯ ফেব্রুয়ারি:
বাংলার রাজনীতিতে ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের দামামা কার্যত বেজে গিয়েছে। এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণা না হলেও রাজনৈতিক মহলে উত্তাপ এখনই চরমে। রাজনৈতিক সূত্রের খবর, আগামী মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহেই নির্বাচনসূচি ঘোষণা হতে পারে। তার আগেই প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে তোড়জোড় শুরু করেছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস।
দলীয় অন্দরমহল থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল—সর্বত্র এখন একটাই প্রশ্ন, কোন আসনে কে পাচ্ছেন টিকিট?
বিশেষ করে আসানসোল লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত সাতটি বিধানসভা কেন্দ্রকে ঘিরে জল্পনা তুঙ্গে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, এবারে প্রার্থী বাছাইয়ে কোনওরকম ঝুঁকি নিতে চাইছে না তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের সুপ্রিমো মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিটি কেন্দ্রেই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন। সেই কারণে বর্তমান বিধায়কদের কাজকর্মের মূল্যায়নের পাশাপাশি নতুন ও সম্ভাবনাময় মুখগুলিকেও কড়া পরীক্ষার মধ্যে রাখা হয়েছে।
এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে বিভিন্ন সমীক্ষা সংস্থা। এবি টিম, আইপ্যাক এবং গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্ট সরাসরি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে পৌঁছচ্ছে বলে খবর। কোন নেতা জনমানসে কতটা গ্রহণযোগ্য, সরকারের কাজের প্রভাব কোথায় কতটা এবং কোন মুখ সামনে রাখলে জয়ের সম্ভাবনা বেশি—সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা, এই সমস্ত সমীক্ষা রিপোর্ট বিশ্লেষণ করেই ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই প্রার্থীদের নামের উপর চূড়ান্ত সিল পড়তে পারে। কৌশলগতভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যাতে তৃণমূল প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করতে পারে, ফলে বিরোধীরা প্রস্তুতির সময় কম পায়।
এরই মধ্যে টিকিটপ্রত্যাশীদের অস্থিরতা স্পষ্ট। কলকাতা থেকে জেলা—সব জায়গাতেই বেড়েছে নেতাদের দৌড়ঝাঁপ। কেউ বাড়াচ্ছেন জনসংযোগ, কেউ আবার শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে নিজের ‘রিপোর্ট কার্ড’ পৌঁছে দিতে ব্যস্ত।
আসানসোল লোকসভা কেন্দ্রের বিধানসভাগুলিতে যেসব নাম উঠে আসছে:
আসানসোল উত্তর:
মলয় ঘটক (বর্তমান বিধায়ক ও রাজ্যের আইন ও শ্রমমন্ত্রী),
অমরনাথ চট্টোপাধ্যায় (আসানসোল পুরনিগমের চেয়ারম্যান),
আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় (প্রাক্তন আমলা),
সুদেষ্ণা ঘটক (সমাজকর্মী),
গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় (মেয়র পারিষদ)
আসানসোল দক্ষিণ:
মনোজ তিওয়ারি (ক্রিকেটার),
ইমন চক্রবর্তী (গায়িকা),
অশোক রুদ্র (শিক্ষক নেতা ও কাউন্সিলার)
রানিগঞ্জ:
বাবুল সুপ্রিয় (প্রাক্তন সাংসদ ও রাজ্যের মন্ত্রী),
তাপস বন্দ্যোপাধ্যায় (বর্তমান বিধায়ক),
কবি দত্ত (আড্ডার চেয়ারম্যান),
পার্থ দেওয়াসি (ছাত্র নেতা)
জামুড়িয়া:
হরেরাম সিং (বর্তমান বিধায়ক),
সোনালি কাজি (কবি কাজি নজরুল ইসলামের পরিবারের সদস্য),
সুব্রত অধিকারী (মেয়র পারিষদ)
কুলটি:
পার্ণো মিত্র (অভিনেত্রী),
উজ্জ্বল চট্টোপাধ্যায় (প্রাক্তন বিধায়ক),
মলয় ঘটক (মন্ত্রী)
পাণ্ডবেশ্বর:
নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী (বর্তমান বিধায়ক ও জেলা সভাপতি),
শুভশ্রী গাঙ্গুলি (অভিনেত্রী),
ভি. শিবদাসন ওরফে দাসু,
উত্তম মুখোপাধ্যায়
বারাবনি:
বিধান উপাধ্যায় (বর্তমান বিধায়ক ও মেয়র),
একজন অভিনেত্রী ও একজন সমাজকর্মীর নামও আলোচনায়
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত বিধানসভা নির্বাচনে কুলটি ও আসানসোল দক্ষিণ কেন্দ্র তৃণমূলের হাতছাড়া হয়েছিল, যেখানে বিজেপি জয়লাভ করে। সূত্রের খবর, এই দুই কেন্দ্র পুনরুদ্ধারে বিশেষভাবে জোর দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশি বাকি পাঁচটি কেন্দ্রের বর্তমান বিধায়কদের পারফরম্যান্সও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, এবারের টিকিট বণ্টন শুধুই সংগঠনের অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়—তথ্য, সমীক্ষা ও মাটির স্তরের প্রতিক্রিয়ার ত্রিমুখী বিশ্লেষণের উপরই নির্ভর করছে তৃণমূলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। কে বাজিমাত করবেন আর কার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হবে, তা পরিষ্কার হবে আগামী কয়েক সপ্তাহেই।





