ভিডিও

আসানসোলে ‘কম্বল কাণ্ড’-এর জেরে পুরুষশূন্য রাইপাড়া, গ্রেপ্তারের আতঙ্কে ঘরছাড়া বাসিন্দারা

নির্ভীক বাংলা,আসানসোল, পশ্চিমবঙ্গ:
আসানসোল নর্থ থানার অন্তর্গত ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের রাইপাড়া এলাকা গত কয়েকদিন ধরে কার্যত পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে। এলাকার মহিলাদের অভিযোগ, পুলিশি ধরপাকড় ও গ্রেপ্তারের ভয়ে কেউ স্বামী, কেউ ভাই, কেউ ছেলে বা আত্মীয়—সবাই বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় শুধুমাত্র মহিলা ও ছোট ছোট শিশুরাই বসবাস করছেন।
স্থানীয় মহিলাদের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপির রাজনৈতিক সংঘাতের শিকার হচ্ছেন তাঁদের এলাকার সাধারণ মানুষ। তাঁদের অভিযোগ, ভোট বা উৎসবের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সমাজসেবীরা পোশাক, কম্বল-সহ নানা সামগ্রী বিতরণ করতে আসেন, আর সেখান থেকেই অশান্তির সূত্রপাত হয়।
ঘটনার সূত্রপাত, কল্লা মোড়ের বাসিন্দা সমাজসেবী ও বিজেপি নেতা কৃষ্ণা প্রসাদ তাঁর সহযোগীদের নিয়ে সালাডাঙা এলাকায় কম্বল বিতরণ করতে গেলে। অভিযোগ, ওই সময় রাইপাড়া ও ছুঁতা ডাঙা এলাকা থেকে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজনও কম্বল নিতে উপস্থিত হন। প্রথমে অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে চললেও পরে তৃণমূলের কয়েকজন কর্মী সেখানে এসে কৃষ্ণা প্রসাদের বিরুদ্ধে ‘গো ব্যাক’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ায় কৃষ্ণা প্রসাদ এলাকা ছেড়ে চলে যান। এরপর তাঁর সমর্থকেরা বাকি কম্বলগুলি বিতরণ করেন।
এরপরই সালাডাঙা সংলগ্ন একটি গ্রামের এক মহিলা কৃষ্ণা প্রসাদ ও তাঁর কয়েকজন সমর্থকের বিরুদ্ধে কম্বল বিতরণের সময় শ্লীলতাহানির অভিযোগ তোলেন। পাশাপাশি তিনি অভিযোগ করেন, কৃষ্ণা প্রসাদ তাঁর জমি দখল করে নিয়েছেন।
এই অভিযোগকে সামনে রেখে তৃণমূল নেতা শ্যাম সোরেনের নেতৃত্বে আদিবাসী সমাজের মানুষজন আসানসোল নর্থ থানার সামনে বিক্ষোভ দেখান এবং কৃষ্ণা প্রসাদ ও তাঁর সমর্থকদের গ্রেপ্তারের দাবি তোলেন। এরপর পুলিশ তদন্ত শুরু করে এবং একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালায়।
তল্লাশির সময় রাইপাড়া এলাকার বাসিন্দা পুষ্পরাজ দাসকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর গ্রেপ্তারের পরই রাইপাড়ার প্রায় সব পুরুষ বাসিন্দা গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। ফলে গোটা এলাকা কার্যত মহিলা ও শিশুশূন্য নয়, বরং পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে রাইপাড়া, সালাডাঙা ও ছুঁতা ডাঙা-সহ ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের একাংশ আদিবাসী সমাজ কৃষ্ণা প্রসাদের সমর্থনে পথে নেমেছে। তাঁদের দাবি, আসানসোল নর্থ থানায় দায়ের করা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং অবিলম্বে তা প্রত্যাহার করা উচিত। দাবি না মানলে পুলিশ ও তৃণমূলের বিরুদ্ধে আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
গ্রেপ্তার হওয়া পুষ্পরাজ দাসের ভগ্নীপতি শুভ্রা দাস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“কম্বল বিতরণ হচ্ছিল সালাডাঙায়। কিন্তু তৃণমূল কর্মীরা প্রতিবাদ করতে এসে রাইপাড়া-সহ বিভিন্ন এলাকার নিরীহ মানুষদের নাম জড়িয়ে মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে। আমাদের এলাকায় এখন একজন পুরুষও নেই। সবাই গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে গিয়েছে। এতে মহিলাদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে। এভাবে চললে পরিবারগুলির না খেয়ে থাকার অবস্থা হবে, শিশুদের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যাবে।”
উল্লেখ্য, কয়েক বছর আগে আসানসোল নর্থ থানারই রামকৃষ্ণ ডাঙালে বিজেপির তরফে এক বিশাল কম্বল বিতরণ কর্মসূচি হয়েছিল, যেখানে বিজেপি নেতা জিতেন্দ্র তিওয়ারির নেতৃত্বে শুভেন্দু অধিকারী-সহ একাধিক শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। সেই কর্মসূচিতে হঠাৎ পদদলিত হয়ে তিনজন মহিলার মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় জিতেন্দ্র তিওয়ারি-সহ একাধিক বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয় এবং গ্রেপ্তারিও হয়েছিল।
তারপর আসানসোলে এটাই দ্বিতীয় ‘কম্বল কাণ্ড’। যদিও এবারের ঘটনায় না কোনও পদদলন হয়েছে, না কোনও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবুও কম্বল বিতরণকে কেন্দ্র করে তোলা গুরুতর অভিযোগে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আদিবাসী সমাজও কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত—এক পক্ষ অভিযোগকে সত্য প্রমাণের চেষ্টা করছে, অন্য পক্ষ পুরো ঘটনাকে তৃণমূলের পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বলে দাবি করছে। তাঁদের বক্তব্য, এই ধরনের ঘটনার ফলে ভবিষ্যতে দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে আর কেউ এগিয়ে আসবে না।
এ বিষয়ে বিজেপির রাজ্য স্তরের নেতা কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায় ঘটনার তীব্র নিন্দা করে কৃষ্ণা প্রসাদ ও তাঁর সমর্থকদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ‘মিথ্যা মামলা’র প্রতিবাদে জোরদার আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

TAGS

সম্পর্কিত খবর