নির্ভীক বাংলা,আসানসোল–বারাবনি বিধানসভা এলাকার গোরাণ্ডি–কাসকুলি অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলা অবৈধ পাথর খনন ও ক্রাশার মেশিনের বিরুদ্ধে এবার সরব হল আদিবাসী সমাজ। প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে ভারত জাকাত মাঝি পরগণা মহল-এর পক্ষ থেকে পশ্চিম বর্ধমান জেলার জেলাশাসকের কাছে একটি লিখিত স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়েছে। অবিলম্বে অবৈধ খনন ও ক্রাশার বন্ধের দাবি জানানো হয়েছে ওই স্মারকলিপিতে।
আদিবাসী সমাজের অভিযোগ, কোনো ধরনের সরকারি অনুমতি ছাড়াই গোরাণ্ডি এলাকায় পাথর মাফিয়ারা নির্বিঘ্নে খনন ও ক্রাশার চালাচ্ছে। এর ফলে ব্যাপকভাবে ধ্বংস করা হচ্ছে বনভূমি। হাজার হাজার গাছ কেটে, স্থানীয় কিছু মানুষকে সামান্য অর্থের লোভ দেখিয়ে এই বেআইনি কার্যকলাপ চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই খনি ও ক্রাশারগুলির কাছে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের কোনও ছাড়পত্র নেই, নেই রাজ্য বা কেন্দ্র সরকারের বৈধ খনন অনুমতিও। তবুও নিয়মিত বিস্ফোরণের মাধ্যমে পাথর ভাঙা হচ্ছে। অভিযোগ, জঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায় গোপনে বিস্ফোরক মজুত রাখা হয়েছে। সেই বিস্ফোরণের তীব্রতায় গোটা এলাকা কেঁপে উঠছে এবং আশপাশের গ্রামগুলির বাড়িতে ফাটল দেখা দিচ্ছে।
ভারত জাকাত মাঝি পরগণা মহলের সদস্য স্বপন মুর্মু বলেন,
“আমাদের সমাজ যুগ যুগ ধরে জল, জঙ্গল ও জমির রক্ষক। জঙ্গল আমাদের কাছে দেবতার সমান। কেউ যদি বেআইনিভাবে জঙ্গল ধ্বংস করে, তাহলে আদিবাসী সমাজ চুপ করে বসে থাকবে না। শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমরা আমাদের সংস্কৃতি ও প্রকৃতি রক্ষা করব।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ক্রাশার থেকে উড়ে আসা ধুলো ও দূষণের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে উঠেছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে, ঘরের ছাদ, কাপড়চোপড় এমনকি খাবার পর্যন্ত ধুলোয় ঢেকে যাচ্ছে। অবৈধ খননের জেরে গোটা এলাকায় বসবাস করা দুষ্কর হয়ে পড়েছে।
আদিবাসী সমাজের দাবি, বিষয়টি আগে বারাবনি থানাকেও জানানো হয়েছিল, কিন্তু কোনও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের নীরবতার কারণেই শেষ পর্যন্ত তারা জেলাশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে ডি.সি.আর. (DCR) ব্যবস্থায় খনি মালিকরা মাসিক প্রায় ৮০ হাজার টাকা ফি দিয়ে খনন চালাতেন। তবে সেই ব্যবস্থাতেও বিস্ফোরক ও পরিবেশ সংক্রান্ত নিয়মের ব্যাপক লঙ্ঘন হতো। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য সরকার ২০১৬ সালে নতুন খনন নীতি চালু করে। সেই নীতি অনুযায়ী সরকারি জমির পাথর সরকার নিজেই নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে এবং ব্যক্তিগত জমিতে খননের ক্ষেত্রে প্রায় সাড়ে সাত বিঘা জমির জন্য পাঁচ বছরের অনুমতি দেওয়া হয়। তবে তার জন্য জিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া, দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ, বন দফতরসহ একাধিক দফতরের এনওসি বাধ্যতামূলক।
অভিযোগ, গোরাণ্ডি এলাকায় খনি চালানো ব্যক্তিরা শুধুমাত্র জমি সংক্রান্ত কিছু নথি জমা দিয়ে এলওয়াই (LY) কাগজ সংগ্রহ করেছে। কিন্তু খননের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য কোনও দফতরের অনুমতি নেওয়া হয়নি। তবুও প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার পাথর উত্তোলন করে সরকারকে বিপুল রাজস্ব ক্ষতির মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়, জঙ্গলে বিপুল পরিমাণে মজুত রাখা বিস্ফোরক কার আশ্রয়ে রয়েছে? এই বিস্ফোরক যদি ভুল হাতে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে আসানসোল এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে বড়সড় আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এখন দেখার, জেলা প্রশাসন এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে কবে এবং কী ধরনের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে।





