নির্ভীক বাংলা,আসানসোল, পশ্চিমবঙ্গ: আসন্ন ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে যখন রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে, ঠিক তখনই আসানসোলের রাস্তায় দেখা মিলছে এক ভিন্ন চিত্রের। গেরুয়া পোশাক পরে, হাতে একতারা নিয়ে ৫৬ বছরের লোকশিল্পী স্বপন দত্ত বাউল তাঁর বাউল গানের মাধ্যমে মানুষকে শান্তিপূর্ণ, ইতিবাচক ও সচেতন ভোটদানের বার্তা দিচ্ছেন। তাঁর এই উদ্যোগ যেমন অনন্য, তেমনই গণতন্ত্রের মূল মূল্যবোধকে শক্তিশালী করার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা।
বহু বছর ধরে বাউল ধারার সঙ্গে যুক্ত স্বপন দত্ত বর্তমানে আসানসোল ও আশেপাশের এলাকায় ঘুরে ঘুরে মানুষকে তাদের ভোটাধিকার সম্পর্কে সচেতন করছেন। তাঁর গানের মূল বার্তা— “ভয় ও হিংসা থেকে দূরে থেকে নিজের ভোটের সঠিক ব্যবহার করুন।” তিনি সাধারণ মানুষকে আহ্বান জানান, যেন তারা কোনো চাপ ছাড়াই নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেন এবং এমন সরকার নির্বাচন করেন, যারা মানুষের সমস্যাকে বোঝে।
বাউল গান, যা বাংলার সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, বরাবরই আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিক বার্তা বহন করে এসেছে। স্বপন দত্ত সেই ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে আধুনিক সামাজিক বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর গানে গণতন্ত্র, শান্তি, সম্প্রীতি ও উন্নয়নের মতো বিষয়গুলি বিশেষভাবে উঠে আসে। তাঁর কথায়, “লোকগান শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি সমাজকে দিশা দেখানোরও একটি পথ।”
এই উদ্যোগ স্বপন দত্তের কাছে নতুন নয়। তিনি জানান, ২০১৬ সাল থেকে প্রতিটি নির্বাচন—পুরসভা, লোকসভা বা বিধানসভা—সব ক্ষেত্রেই তিনি এইভাবে মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছড়িয়ে আসছেন। তাঁর মতে, নির্বাচনের সময় সমাজে প্রায়ই ভয় ও উত্তেজনার পরিবেশ তৈরি হয়, যা দূর করা অত্যন্ত জরুরি। “মানুষ যদি নির্ভয়ে ভোট দিতে পারে, তবেই প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে,” বলেন তিনি।
এ পর্যন্ত স্বপন দত্ত পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি জেলায় তাঁর অনুষ্ঠান করেছেন। গ্রাম থেকে শহর—সব জায়গায় গিয়ে তিনি মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করেন এবং গানের মাধ্যমে সচেতনতা বাড়ান। কোনো আর্থিক লাভের প্রত্যাশা ছাড়াই, নিঃস্বার্থভাবে তিনি এই কাজ করে চলেছেন, যা মানুষের মধ্যে গভীর প্রভাব ফেলছে।
তাঁর এই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবদানের জন্য ইতিমধ্যেই তিনি বহু বিশিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে সম্মান পেয়েছেন। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি, বর্তমান উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখড় এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ অনেকেই তাঁকে সম্মানিত করেছেন। তবে তাঁর একটি বড় স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি—পদ্মশ্রী সম্মান লাভ।
স্বপন দত্ত বলেন, “এতদিন যে সম্মান পেয়েছি, তা আমার কাছে গর্বের বিষয়। কিন্তু আমি চাই, আমার এই কাজ জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি পাক। পদ্মশ্রী পাওয়া আমার স্বপ্ন, আর সেই লক্ষ্যেই আমি কাজ করে যাচ্ছি।”
স্থানীয় বাসিন্দারাও তাঁর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। একজন বলেন, “এখনকার দিনে ভোটের সময় হিংসা আর উত্তেজনা খুবই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে স্বপন দত্তের মতো মানুষ সমাজকে সঠিক পথ দেখাচ্ছেন। তাঁর গান শুধু মনোরঞ্জনই করে না, মানুষকে ভাবতেও বাধ্য করে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের সাংস্কৃতিক উদ্যোগ গণতন্ত্রকে আরও মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। সহজ ভাষায় ও লোকসংস্কৃতির মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দিলে তা মানুষের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। স্বপন দত্ত বাউলের এই প্রচেষ্টা তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
আসানসোলের অলিগলিতে তাঁর একতারার সুর যেন মনে করিয়ে দেয়—গণতন্ত্র শুধু একটি ব্যবস্থা নয়, এটি একটি দায়িত্বও। আর সেই দায়িত্ব পালনে প্রয়োজন সচেতনতা, সাহস ও সঠিক সিদ্ধান্ত।
আগামী নির্বাচনে তাঁর এই প্রচেষ্টা কতটা প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, তাঁর সুরেলা বার্তা সমাজে এক ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে—“ভয়মুক্ত, হিংসামুক্ত এবং সচেতন ভোটদান”—যা আজকের সময়ে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
স্বপন দত্ত বাউলের এই যাত্রা শুধু একজন শিল্পীর গল্প নয়, বরং একজন দায়িত্ববান নাগরিকের কাহিনি, যিনি নিজের সৃষ্টিশীলতার মাধ্যমে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার কাজে ব্রতী। তাঁর পদ্মশ্রী পাওয়ার স্বপ্নও সেই নিরলস প্রচেষ্টারই প্রতিফলন।




