পশ্চিম বর্ধমান :- আদিবাসী দিশম মাঝি পারগানা মহলের ব্যানারে দীর্ঘ দিন ধরে একটানা ধর্না কর্মসূচি চললেও, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সদর্থক পদক্ষেপ বা প্রশাসনিক স্তরে আলোচনার উদ্যোগ না নেওয়ায় অবশেষে আন্দোলনের পথ আরও তীব্র করেছে আদিবাসী সমাজ। নিজেদের মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের দাবিতে গত ১লা সেপ্টেম্বর জামুরিয়ার কেন্দা এলাকা থেকে ৬০ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে রানীগঞ্জের ১৯ নম্বর জাতীয় সড়কে এসে পৌঁছায় এই প্রতিবাদী মিছিল। সেখান থেকে সোজা পশ্চিম বর্ধমান জেলাশাসক বা ডিএম (DM) অফিস পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এক সুদীর্ঘ পদযাত্রার ডাক দেওয়া হয়। আর এই ঐতিহাসিক পদযাত্রায় পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে রাজপথে নেমে আসেন ভীম আর্মির নেতৃত্ব ও কর্মীরা।
তবে এই পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়ায় প্রশাসনিক মহলে। পুলিশ প্রশাসন জাতীয় সড়কের ওপর দিয়ে পদযাত্রায় কড়া বাধা দেয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যুক্তি দিয়ে জানানো হয় যে, ১৯ নম্বর জাতীয় সড়ক অত্যন্ত ব্যস্ততম এবং দ্রুত গতিতে গাড়ি যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। ফলে সেখানে সাধারণ মানুষের পদযাত্রা কোনোভাবেই নিরাপদ নয় এবং সেই কারণেই পদযাত্রা করে জাতীয় সড়কের ওপর দিয়ে যাওয়া যাবেনা বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় পুলিশের তরফ থেকে। প্রশাসনের তরফে বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে এও বলা হয় যে, জাতীয় সড়কের ওপর দিয়ে আন্দোলনকারীরা যদি গাড়ি বা অন্য কোনো যানবাহনে চড়ে তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে চান, তবে তাতে প্রশাসনের কোনো বাধা থাকবে না।
কিন্তু প্রশাসনের এই শর্ত এবং পদযাত্রায় বাধার মুখে পড়ে জাতীয় সড়কেই তীব্র বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন আন্দোলনকারীরা। তাদের স্পষ্ট দাবি, প্রশাসনের এই অসহযোগিতা আন্দোলনকে দমানোর এক ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারে সহযোগিতা করা না হয়, তবে আগামী দিনে এই আন্দোলন আরও বৃহত্তর আকার ধারণ করবে এবং সমগ্র রাজ্যে ছড়িয়ে পড়বে।
এই বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভীম আর্মির রাজ্য সভাপতি সুশীল আম্বেদকর অত্যন্ত জোরালো ভাষায় রাজ্য সরকারকে আক্রমণ করে জানান, "১৬০ দিনেরও বেশি সময় ধরে আদিবাসী সমাজের প্রতিনিধিরা লাগাতার ধর্নায় বসে আছেন। অথচ দীর্ঘ এই সময়ে সরকার তাদের কোনো খোঁজ নেয়নি, তাদের দাবিগুলো নিয়ে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেনি। তাই আজ বাধ্য হয়ে ৩০ কিলোমিটার পদযাত্রা করে ডিএম অফিসের দিকে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ভীম আর্মি এই ন্যায্য আন্দোলনকে সর্বতোভাবে সমর্থন জানাচ্ছে এবং আমরা আদিবাসী ভাই-বোনদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই লড়াই চালিয়ে যাব।"
তিনি আরও ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেন, "জল, জঙ্গল, জমি, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের দাবি কোনো ব্যক্তিগত বা খয়রাতির দাবি নয়। এটি সরাসরি আদিবাসী মানুষের অস্তিত্ব, সংস্কৃতি ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার লড়াই। যাদের পৈতৃক জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে অথচ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি দেওয়া হয়নি, যাদের ছেলেমেয়েরা হোস্টেল ও মানসম্মত শিক্ষার অধিকার থেকে সুকৌশলে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে—আমরা সবসময় তাদের পাশে আছি। আন্দোলনের এই জোরালো কণ্ঠকে রুদ্ধ করার জন্য পুলিশ ও প্রশাসনকে ব্যবহার করা হলেও আমাদের এই যৌথ লড়াই কোনোভাবেই থামানো যাবে না।"
সব মিলিয়ে, ভীম আর্মির এই স্পষ্ট ও হুঙ্কারপূর্ণ বার্তার পর রাজ্য রাজনীতিতে নতুন করে জলঘোলা শুরু হয়েছে। আদিবাসী দিশম মাঝি পারগানা মহল এবং ভীম আর্মির যৌথ এই আন্দোলন এখন এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। রাজ্য সরকার যদি অবিলম্বে আদিবাসী সমাজের জল, জঙ্গল, জমি, শিক্ষা ও চাকরির মতো এই মৌলিক ও ন্যায্য দাবিগুলো পূরণ না করে, তবে আগামী দিনে এই গণআন্দোলন গোটা রাজ্য জুড়ে এক অদম্য রূপ ধারণ করতেই পারে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

