निర్భীক বাংলা, আসানসোল: বাজার আগুন এবং সাধারণ মানুষের পকেট খালি করে শাকসবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের লাগাতার দাম বৃদ্ধি নিয়ে এবার কড়া অবস্থান নিয়েছে রাজ্য সরকার। সাধারণ মানুষের স্বস্তি ফেরাতে এবং লাগামছাড়া মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজ্য প্রশাসনের নির্দেশিকা অনুযায়ী পশ্চিম বর্ধমান জেলাজুড়ে জোরদার নজরদারি শুরু হয়েছে। সম্প্রতি যেভাবে আলু-পেঁয়াজ থেকে শুরু করে শাকসবজি, চাল ও ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, তাতে চরম বিপাকে পড়েছেন মধ্যবিত্ত ও সাধারণ ক্রেতারা। এই পরিস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী, খোদ মাঠে নেমেছেন পশ্চিম বর্ধমান জেলার জেলাশাসক এস. পোনাম বালাম। বাজারের প্রকৃত পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে তিনি নিজে আসানসোলের বিভিন্ন বাজার পরিদর্শন করেন এবং বিক্রেতা ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলেন।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অভিযোগ আসছিল। রাজ্য সরকারের শীর্ষ মহলের নজর এড়ায়নি এই সংকটজনক পরিস্থিতি। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর আহ্বানে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এরপরেই মুখ্যমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশ অনুযায়ী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পশ্চিম বর্ধমান জেলায় মোট চারটি বিশেষ টাস্কফোর্স বা এক্সিকিউটিভ টিম গঠন করা হয়েছে। এই দলগুলির কাজের পরিধি এবং ক্ষেত্র স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আসানসোল পৌরনিগম এলাকার মধ্যে সুষ্ঠুভাবে নজরদারির জন্য দুটি পৃথক টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে, পৌরনিগম সীমানার বাইরের গ্রামীণ ও অন্যান্য শহরাঞ্চলের জন্য মহকুমাশাসকদের (SDO) নেতৃত্বে পৃথক দল গঠন করা হয়েছে, যারা নিয়মিত বাজারগুলি পরিদর্শন করবেন। পাইকারি বাজার থেকে শুরু করে খুচরা বাজার—প্রতিটি স্তরেই এই নজরদারি চালানো হবে।
টাস্কফোর্সের প্রধান দায়িত্ব হল বিভিন্ন বাজার ঘুরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বর্তমান দাম খতিয়ে দেখা। কোনো অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট কৃত্রিমভাবে পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করছে কিনা বা কোথাও মজুতদারি ও কালোবাজারির মতো অবৈধ কারবার চলছে কিনা, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখা হবে। পাশাপাশি, গ্রাহকদের ঠকানোর হাত থেকে বাঁচাতে দোকানের ওজন মাপার যন্ত্র বা বাটখারা ঠিকমতো কাজ করছে কি না এবং পরিমাপ সংক্রান্ত নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করতে আকস্মিক তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ বাজার পরিদর্শনের সময় জেলাশাসকের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি কমিশনার (সেন্ট্রাল), অতিরিক্ত জেলাশাসক (ADM), আসানসোল পৌরনিগমের কমিশনার সহ কৃষি বিভাগ, কৃষি বিপণন বিভাগ, উপভোক্তা বিষয়ক বিভাগ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। প্রশাসনের এই শীর্ষ আধিকারিকদের উপস্থিতিতে বাজারে শোরগোল পড়ে যায়।
প্রশাসন কেবল বিক্রেতাদের যুক্তির ওপর নির্ভর করছে না, বরং সরাসরি ভোক্তাদের কাছ থেকেও পণ্যের দাম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পাইকারি বাজারে যে দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে, খুচরা বাজারের দাম এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ ক্রেতারা যে দামে তা কিনছেন—তার একটি তুলনামূলক হিসাব তৈরি করছে প্রশাসন। তদন্তের সময় যদি কোনো ধরনের অনির্চলতা, কৃত্রিম সংকট তৈরি, অবৈধ মজুতদারি বা অকারণে নজিরবিহীন দাম বাড়ানোর প্রমাণ মেলে, তবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেছে প্রশাসন।
জেলাশাসক এস. পোনাম বালাম অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, রাজ্য সরকার ২৪ ঘণ্টা বর্তমান বাজারের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। কোনো বিক্রেতা বা সিন্ডিকেট যদি কোনো যৌক্তিক বা বাস্তবসম্মত কারণ ছাড়াই নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করে, তবে তা বরদাস্ত করা হবে না।
সাধারণ মানুষের রান্নার মৌলিক উপকরণ যেমন চিনি, চাল এবং পেঁয়াজের ক্রমবর্ধমান দাম নিয়ে প্রশাসন বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন। তাই এই তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের দামের ওপর এখন থেকে বিশেষ ও নিয়মিত নজরদারি রাখা হবে। আসানসোল শহর ছাড়াও রানিগঞ্জ, দুর্গাপুর, রূপনারায়ণপুর, কুলটি এবং বার্নপুর সহ পশ্চিম বর্ধমান জেলার সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান বাজারে এই বিশেষ টাস্কফোর্সের অভিযান নিরবিচ্ছিন্নভাবে চলবে। প্রশাসনের এই কড়া পদক্ষেপে অসাধু ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং শাকসবজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর শীঘ্রই নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে আশা করছেন সাধারণ মানুষ।

