আসানসোলে বিজেপির একটি কথিত ভাইরাল পত্রকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র শোরগোল শুরু হয়েছে। পশ্চিম বর্ধমান জেলার শিল্পাঞ্চল আসানসোলে থানা ও হাসপাতালের মতো সংবেদনশীল ও জনস্বার্থের জায়গায় দলীয় প্রতিনিধি নিয়োগ এবং পরবর্তীতে তা প্রত্যাহারের দাবি সংক্রান্ত একটি চিঠি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে ওঠে। একদিকে বিরোধী দল কংগ্রেস এই ঘটনায় শাসকদল বা প্রধান বিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে সরাসরি অভিযোগ তুলেছে, অন্যদিকে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) পক্ষ থেকে এই চিঠিকে সম্পূর্ণ 'ভুয়ো' এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর স্থানীয় স্তরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে এবং প্রশাসনিক মহলও বিষয়টি নিয়ে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আসানসোল সাংগঠনিক জেলা বিজেপির দক্ষিণ মণ্ডল-১ এর সভাপতি সোমনাথ মণ্ডলের নাম এবং প্যাড ব্যবহার করে একটি চিঠি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সালের তারিখ দিয়ে জারি করা ওই চিঠিতে বলা হয়েছিল, থানা ও হাসপাতাল সংক্রান্ত বিষয়ে দল থেকে পূর্বে যাদের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেই সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক প্রভাবে বাতিল করা হচ্ছে। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, এর পর থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পুলিশ স্টেশন বা হাসপাতালের সঙ্গে দলীয় সমন্বয়রক্ষার জন্য দলের কোনো অধিকৃত প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য হবেন না। এই চিঠির নিচে একটি সীলমোহরও দেখা যায়, যা এর সত্যতা নিয়ে জল্পনা আরও বাড়িয়ে দেয়।
এর আগে যে তথ্যগুলি সামনে এসেছিল তাতে দাবি করা হয়েছিল যে, আসানসোল দক্ষিণ পুলিশ ফাঁড়ি (পিপি) এবং হীরাপুর থানার জন্য পৃথকভাবে বিজেপির প্রতিনিধি দল মনোনীত করা হয়েছে। আসানসোল দক্ষিণ পিপির জন্য উত্তম কর্মকার, অনুপ সিং এবং রাহুল রায় এবং হীরাপুর থানার জন্য অরুণ বাউরি, কাজল চক্রবর্তী ও রোহিত কেউড়ার নাম প্রচার করা হয়। দাবি করা হয়েছিল যে এই প্রতিনিধিরা মণ্ডলের সাধারণ মানুষের হয়ে সংশ্লিষ্ট থানাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখবেন। তবে আকস্মিকভাবে সেই দায়িত্ব প্রত্যাহারের বিজ্ঞপ্তি সামনে আসতেই বিরোধী শিবির সোচ্চার হয়ে ওঠে।
কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ পোইতুণ্ডি এই বিষয়ে বিজেপিকে আক্রমণ করে তীব্র ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দলের মণ্ডল সভাপতিকে থানা চালানোর বা পুলিশের কার্যপ্রণালীতে নাক গলানোর অধিকার কে দিয়েছে? প্রসেনজিৎ বাবুর অভিযোগ, এর নেপথ্যে পুলিশ প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা চলছে। তিনি দাবি করেন যে, নির্দিষ্ট কিছু মহলের রাজনৈতিক প্রভাবে সাধারণ মানুষের পুলিশি পরিষেবা পাওয়ার অধিকার বিঘ্নিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, থানায় বা হাসপাতালে সাধারণ মানুষ নাগরিক অধিকারের ভিত্তিতে যান, সেখানে কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রতীক বা গামছা পরে মধ্যস্থতা করার প্রথা চালু করা হলে তা সংবিধানসম্মত প্রশাসনিক কাঠামোর পরিপন্থী। অতীতে বাম জমানা বা দীর্ঘ তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনেও এ ধরনের নজির দেখা যায়নি বলে দাবি করেন তিনি। পাশাপাশি, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে কাটমানি বা সাইফনিংয়ের মতো বিষয় নিয়েও তিনি কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে, কংগ্রেসের সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে খারিজ করে দিয়েছেন আসানসোল উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখার্জি। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ওই চিঠিটি সম্পূর্ণ ভুয়া এবং এটি বিজেপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি সুষ্পষ্ট চক্রান্ত। মণ্ডল সভাপতি সোমনাথ মণ্ডলকে অত্যন্ত পরিশ্রমী ও সৎ কর্মী হিসেবে উল্লেখ করে বিধায়ক বলেন, তিনি বা দল এ ধরনের কোনো চিঠি বা নির্দেশিকা জারি করেননি। সোমনাথ বাবুর সীলমোহর ও নাম ব্যবহার করে কেউ বা কারা এই জালিয়াতি করেছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। বিজেপির বিধায়ক আরও জানান, বিরোধীরা রাজনৈতিক ফায়দা তোলার জন্যই এই ধরনের বানোয়াট বিষয় নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
সবমিলিয়ে, আসানসোলের এই ভাইরাল পত্রের সত্যতা নিয়ে এখন বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। একদিকে প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে কংগ্রেস রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে বিজেপি একে পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও ষড়যন্ত্রমূলক বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই চিঠির উৎস কোথায় এবং এর পেছনে প্রকৃত সত্য কী রয়েছে, তা নিয়ে আগামী দিনে কী ধরনের প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। আসানসোলের এই বিতর্কিত ঘটনা আপাতত রাজ্য রাজনীতির অন্যতম হটস্পটে পরিণত হয়েছে।
Breaking News
আসানসোলে থানা ও হাসপাতালে বিজেপি প্রতিনিধির চিঠি ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র শোরগোল

Tags:Nirbhikbangla
