রানীগঞ্জ: মাঝরাতে ২ নম্বর জাতীয় সড়কে জোড়া বিভীষিকা! প্রথম চলন্ত গাড়িতে দাউদাউ আগুন, তারপর কেমিক্যাল ট্যাঙ্কার উল্টে ভয়াবহ বিপর্যয় রানীগঞ্জে। রাত তখন ১২:৪৫। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন গোটা শিল্পাঞ্চল। ঠিক সেই মুহূর্তে ২ নম্বর জাতীয় সড়কে পরপর দুটি ভয়াবহ দুর্ঘটনায় কেঁপে উঠল রানীগঞ্জ। একদিকে আগুনের লেলিহান শিখায় গ্রাস করা চলন্ত গাড়ি, অন্যদিকে বিপজ্জনক কেমিক্যালে সয়লাব হওয়া উল্টে যাওয়া ট্যাঙ্কার—এই দুইয়ের জেরে মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে যায় ব্যস্ততম জাতীয় সড়ক।
প্রথম বিপর্যয় ঘটে রানীসায়ের মোড়ে। গভীর রাতে জাতীয় সড়কের এই ব্যস্ততম অংশে কলকাতা থেকে ধানবাদের দিকে দ্রুতগতিতে যাওয়া একটি চারচাকা গাড়িতে হঠাৎই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে আগুন ধরে যায়। মুহূর্তের মধ্যে দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে গাড়িটি। তবে সৌভাগ্যবশত, গাড়ির ভেতরে থাকা তিন জন যাত্রী সময়মতো আগুনের তীব্র আঁচ টের পান এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত গাড়ি থেকেই বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
এই ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে রানীগঞ্জের পাঞ্জাবি মোড় ফাঁড়ির পুলিশ। ফাঁড়ির আইসি নাজমুল হুদা নিজেই পুরো পরিস্থিতির তদারকি করেন এবং দ্রুত দমকল বিভাগে খবর পাঠান। কিছুক্ষণের মধ্যেই দমকলের একটি ইঞ্জিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে কঠোর প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান ওই তিন যাত্রী, তবে গাড়িটি সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
কিন্তু সেই অগ্নিকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই আরও এক ভয়াবহ বিপদের মুখোমুখি হয় রানীগঞ্জ। প্রথম ঘটনার রেশ কাটতে না পারতেই চুনাভাটি এলাকায় ঘটে দ্বিতীয় বিপর্যয়। হলদিয়া থেকে অত্যন্ত দাহ্য কেমিক্যাল ভর্তি করে হিমাচল প্রদেশের দিকে রওনা দেওয়া একটি বিশাল ট্রেলার-ট্যাঙ্কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জাতীয় সড়কের ওপর সজোরে উল্টে যায়। ট্যাঙ্কারটি উল্টে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার ভেতরে থাকা বিপজ্জনক ও তৈলাক্ত কেমিক্যাল গোটা জাতীয় সড়কের একপ্রান্ত জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
মুহূর্তের মধ্যে সেই কেমিক্যালে রাস্তা অত্যন্ত পিচ্ছিল ও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। দুর্ঘটনার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে সঙ্গে সঙ্গেই ওই অংশে সমস্ত ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং জাতীয় সড়কের উভয় দিকে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। নিত্যযাত্রী ও দূরপাল্লার ট্রাকচালকরা চরম বিপাকে পড়েন।
পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত পদক্ষেপ করে প্রশাসন। ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বিশাল আকৃতির দুটি শক্তিশালী ক্রেন। শুরু হয় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উল্টে যাওয়া ট্যাঙ্কার উদ্ধারের কাজ। পাশাপাশি, সম্ভাব্য বড় দুর্ঘটনা এড়াতে দমকলের ইঞ্জিন এবং বিশাল পুলিশ বাহিনী গোটা এলাকা ঘিরে রাখে। রাস্তার পিচ্ছিলভাব কাটাতে এবং কেমিক্যালের বিষাক্ত প্রভাব কমাতে জল দিয়ে রাস্তা ধুয়ে পরিষ্কার করার কাজ চালানো হয়।
একদিকে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া গাড়ি এবং অন্যদিকে পিচ্ছিল কেমিক্যালে বিপজ্জনক হয়ে ওঠা জাতীয় সড়ক—মাঝরাতের এই জোড়া দুর্ঘটনায় রানীগঞ্জের সাধারণ মানুষ এবং যাতায়াতকারী চালকদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও এই ঘটনায় জাতীয় সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে ফের একবার প্রশ্নচিহ্ন উঠে গেছে।

