কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (এসআইআর) ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিরতা আবার তীব্র হয়েছে। শুক্রবার, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সাথে নয়া টিএমসির 12 সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল...

কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) ঘিরে রাজনৈতিক তৎপরতা ফের তীব্র হয়েছে। শুক্রবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে নব তৃণমূলের ১২ সদস্যের প্রতিনিধিদলের দীর্ঘ বৈঠক হয়। বৈঠকে SIR প্রক্রিয়া, বৈধ ভোটারদের নাম ভোটার তালিকায় সুরক্ষিত রাখা, আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে প্রতিনিধিদলের সদস্য আখেরুজ্জামান স্পষ্ট জানিয়ে দেন, বৈধ ভোটারদের স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষিত না হলে সংগঠন হাই কোর্টের দ্বারস্থ হবে। পাশাপাশি রাজ্যের প্রতিটি জেলা ও ব্লকে আবেদন অভিযান চালানো হবে, যাতে কোনও যোগ্য ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ না পড়ে।
আখেরুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন,
“জেলায় জেলায়, ব্লকে ব্লকে আবেদন করানোর উদ্যোগ নেব। প্রয়োজন হলে দায়িত্ব নিয়ে হাই কোর্টে যাব। এরপর অনুমতি মিললে রাস্তায় নেমেও আন্দোলন করব। SIR নিয়ে আমি বিধানসভার বাজেট অধিবেশনেও বক্তব্য রেখেছিলাম। কুণালবাবু ভুল কথা বলেছেন। উনি আমার বক্তব্য শুনে নিন।”
এই মন্তব্যের পর স্পষ্ট হয়েছে, নব তৃণমূল এবার শুধু প্রশাসনিক নয়, আইনি লড়াই এবং গণআন্দোলন—দুই পথেই এগোতে প্রস্তুত।
মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে ফের বৈঠকের দাবি
বৈঠক শেষে প্রতিনিধিদলের সদস্য ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। SIR-সংক্রান্ত বাকি বিষয়গুলি নিয়ে আরও বিস্তারিত আলোচনার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর কাছে দ্বিতীয় বৈঠকের সময়ও চাওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিনিধিদলের অন্যতম দাবি হল নাম অন্তর্ভুক্তি ও প্রয়োজনীয় আবেদন প্রক্রিয়ার জন্য আরও ছয় মাস অতিরিক্ত সময় দেওয়া। তাঁদের দাবি, এখনও বহু মানুষ পুরো প্রক্রিয়াটি ঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেননি। তাই তাড়াহুড়ো না করে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া উচিত।
বৈঠকের মূল আলোচ্য ছিল SIR
বিধানসভায় তৃণমূলের মুখ্য সচেতক জানান, পুরো বৈঠকের কেন্দ্রবিন্দু ছিল SIR প্রক্রিয়া। তাঁর দাবি, বিভিন্ন নেতার মন্তব্য এবং নানা গুজবের কারণে প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের মধ্যে উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে জোকায় মাত্র একটি ট্রাইব্যুনাল থাকায় কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি-সহ উত্তরবঙ্গের বহু জেলার মানুষকে ভোগান্তির মুখে পড়তে হতে পারে।
তিনি বলেন,
“আমরাও চাই না কোনও অবৈধ ব্যক্তি ভোটার তালিকায় থাকুক। কিন্তু কোনও বৈধ ভোটারের নামও যেন বাদ না যায়।”
সাত লক্ষ আবেদন, তবুও ২০ লক্ষ মানুষ এখনও বিভ্রান্ত
প্রতিনিধিদলের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী বৈঠকে জানিয়েছেন যে এখনও পর্যন্ত প্রায় ৭ লক্ষ মানুষ আবেদন জমা দিয়েছেন। তবে তাঁদের বক্তব্য, প্রায় ২০ লক্ষ মানুষ এখনও SIR প্রক্রিয়া পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। ফলে তাঁরা আবেদন করতে পারেননি।
এই কারণেই বৈধ ভোটারদের স্বার্থরক্ষায় হাই কোর্টে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিনিধিদল জানিয়েছে। তাঁদের লক্ষ্য, তথ্যের অভাব বা প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে কোনও যোগ্য ভোটার যেন ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।
মুখ্যমন্ত্রীর ইতিবাচক আশ্বাস
বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রতিনিধিদলকে আশ্বাস দেন যে সরকারের উদ্দেশ্য কোনও বৈধ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া নয়। প্রতিনিধিদের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে এবং সমস্ত যোগ্য ভোটারের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
তবে প্রতিনিধিদলের বক্তব্য, শুধু আশ্বাস যথেষ্ট নয়। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবিও তাঁরা জানিয়েছেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন
মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, আখেরুজ্জামান, ফিরহাদ হাকিম, জাভেদ খান, সাবিনা ইয়াসমিন, নূর আলম, ইমানি বিশ্বাস, রেয়াত হুসেন সরকার, জেবর শেখ, বুরহানুল ইসলাম লিটন, বাহারুল ইসলাম এবং গোলাম রব্বানি।
বৈঠকের পর আলোচনায় আতিথেয়তা
সূত্রের খবর, নবান্নে প্রতিনিধিদলের আপ্যায়নের জন্য ব্ল্যাক কফি, ফিশ রোল, চিকেন স্প্রিং রোল, কালাকন্দ-সহ বিভিন্ন মিষ্টির ব্যবস্থা ছিল। তবে বৈঠকের মূল ফোকাস ছিল সম্পূর্ণভাবে SIR প্রক্রিয়া এবং ভোটারদের স্বার্থসংক্রান্ত বিষয়।
এবার কী?
এখন নজর থাকবে প্রতিনিধিদল কবে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় এবং সরকার নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য অতিরিক্ত সময় দেওয়ার বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেয় কি না। SIR ইস্যুতে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে আইনি ও রাজনৈতিক তৎপরতা আরও বাড়তে পারে। সরকারের দাবি, বৈধ ভোটারদের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকবে। অন্যদিকে প্রতিনিধিদল চাইছে, সেই আশ্বাস বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।