দুর্গাপুর:- পুনর্বাসন, ক্ষতিপূরণ, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং আদিবাসীদের বন ও ভূমির অধিকার-সহ একাধিক জ্বলন্ত দাবিতে আগামী ১ সেপ্টেম্বর পশ্চিম বর্ধমান জেলা শাসকের দফতরে এক বিরাট গণডেপুটেশনের ডাক দিল আদিবাসী গাঁওতা, পশ্চিম বর্ধমান জেলা কমিটি। শিল্পাঞ্চল এবং কয়লাসমৃদ্ধ এই জেলায় দীর্ঘদিন ধরে আদিবাসী সমাজ যে সমস্ত বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে, তার একটি স্থায়ী ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের দাবিতে এই আন্দোলনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। সংগঠনের এই গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিতে ইতিমধ্যেই 'ইউনাইটেড ফোরাম' সহ বিভিন্ন গণসংগঠন ও সামাজিক মঞ্চ তাদের পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছে।
এই আন্দোলনকে সফল ও সর্বাত্মক করে তোলার লক্ষ্যে বুধবার বিকেলে দুর্গাপুর ভগত সিং স্টেডিয়াম সংলগ্ন এলাকায় একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব আন্দোলনের রূপরেখা ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।
সংগঠনের পক্ষ থেকে বিস্তারিতভাবে জানানো হয় যে, আগামী ১ সেপ্টেম্বর জামুড়িয়া এলাকার শাল ডাঙ্গা গ্রাম থেকে একটি সুসজ্জিত পদযাত্রা শুরু হবে। এই পদযাত্রা বিভিন্ন গ্রামীণ পথ পরিকრমা করে আসানসোলে গিয়ে পৌঁছাবে। সেখানে একটি বিশাল সমাবেশের পর পশ্চিম বর্ধমান জেলা শাসকের দফতরে প্রতিনিধি দল গিয়ে গণডেপুটেশন জমা দেবে এবং স্মারকলিপি পেশ করবে। এই কর্মসূচিতে জেলার আসানসোল, দুর্গাপুর, জামুড়িয়া, রানিগঞ্জ সহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আদিবাসী পরিবার, খেতমজুর, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-যুব এবং বিভিন্ন প্রগতিশীল গণসংগঠনের হাজার হাজার মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সাংবাদিক সম্মেলনে সংগঠনের পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করা হয় যে, কয়লা খনি ও শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রসারণমূলক প্রকল্পের কারণে পশ্চিম বর্ধমান জেলার বহু আদিবাসী পরিবার আজ তাঁদের বাপ-দাদার ভিটেমাটি এবং কৃষিজমি হারানোর চরম আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন। বিশেষ করে শাল ডাঙ্গা সহ বিভিন্ন আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ ও জমি সংক্রান্ত নোটিশ পাঠানোর ঘটনায় তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁদের স্পষ্ট দাবি, উন্নয়নের নামে গরিব আদিবাসীদের বেআইনিভাবে উচ্ছেদ করা চলবে না। উন্নয়নের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ঐতিহ্যগত জমি, জল, জঙ্গল ও জীবিকার অধিকার সর্বতোভাবে সুরক্ষিত করতে হবে।
এদিনের ঘোষণা অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বরের গণডেপুটেশনের মূল পাঁচ দফা দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে— ১) শিল্প ও কয়লা উত্তোলনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির যথাযথ ও মর্যাদাপূর্ণ পুনর্বাসন এবং উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ। ২) অধিগ্রহণ করা জমির বিনিময়ে উপযুক্ত জমি বা প্লট প্রদান। ৩) আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিশেষ সরকারি সহায়তা। ৪) বেকার যুবকদের জন্য স্থায়ী কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা এবং ৫) 'Forest Rights Act, 2006' (বন অধিকার আইন, ২০০৬) অনুযায়ী আদিবাসী জনগণের বন, ভূমি ও জীবিকার অধিকার অবিলম্বে নিশ্চিত করা।
নেতৃত্বের অভিযোগ, এই সমস্ত মৌলিক দাবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরগুলিতে একাধিকবার আবেদন জানানো হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো কার্যকর ও সন্তোষজনক পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যার ফলে বাধ্য হয়েই তাঁদের এই পথ বেছে নিতে হয়েছে।
এছাড়াও, এদিন বিশেষভাবে দাবি তোলা হয় আইকিউ সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জন্য যে সমস্ত আদিবাসী পরিবারগুলি তাদের জমি হারিয়েছিলেন, তাঁদের প্রতিশ্রুতি মতো পরিবারের অন্তত একজন সদস্যকে চাকরি দিতে হবে। সংগঠনের অভিযোগ, প্রশাসনের তরফ থেকে অতীতে একাধিকবার এই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে এখনও বহু পরিবার সেই চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত রয়েছে। পাশাপাশি, এলাকার আদিবাসী ছাত্রছাত্রীদের পঠনপাঠনের সুবিধার জন্য বন্ধ থাকা সরকারি অনুদান ও বৃত্তিমূলক সহায়তা পুনরায় চালু করার দাবিও জোরালোভাবে তোলা হয়েছে।
সবমিলিয়ে, আসন্ন ১ সেপ্টেম্বর পশ্চিম বর্ধমান জেলা শাসকের দফতরে আদিবাসী গাঁওতার এই গণডেপুটেশন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শিল্পাঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে এখন থেকেই চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। আদিবাসী সমাজ তাদের অস্তিত্ব ও অধিকার রক্ষার এই লড়াইয়ে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেটাই এখন দেখার।
পশ্চিম বর্ধমান
জমি, জঙ্গল ও জীবিকার দাবিতে উত্তাল হতে চলেছে পশ্চিম বর্ধমানের শিল্পাঞ্চল

Nirbhik Bangla Photo
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
