রবিবারের এক মনোরম ছুটির দিন যে এভাবে শ্মশানের নীরবতায় পরিণত হবে, তা হয়তো ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি কেউ। পশ্চিম বর্ধমান জেলার শিল্পাঞ্চল বারাবনি ব্লকের অন্তর্গত পানুড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েতের মনোরম মন্দিরা ড্যামে স্নান করতে নেমে ঘটে গেল এক চরম মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। ড্যামের গভীর জলে তলিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেল এক ২১-২২ বছরের তরুণ ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র। নিখোঁজ তরুণের নাম সুপ্রিয় চক্রবর্তী (২২)। তিনি কলকাতার বিখ্যাত ‘এস.এন.ইউ’ (SNU) ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র এবং আসানসোল ও দুর্গাপুরের মুচিপাড়া এলাকার বাসিন্দা বলে জানা গেছে। ছুটির মেজাজে ঘুরতে এসে এমন আকস্মিক বিপর্যয়ে গোটা এলাকায় গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঘটনার আকস্মিকতায় দিশেহারা হয়ে পড়েছে তার পরিবার।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে বিস্তারিত জানা গিয়েছে, রবিবার বিকেলে সুপ্রিয় সহ ছয় বন্ধুর একটি ঘনিষ্ঠ দল একসঙ্গে মন্দিরা ড্যামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ও কিছুটা অবসর সময় কাটাতে আসে। সবুজ পাহাড়, লাল মাটির পথ আর সুনীল জলাধারের এক অপূর্ব সমাহার রয়েছে এই ড্যাম চত্বরে। সেই মনোরম পরিবেশ উপভোগ করার এক পর্যায়ে তারা ড্যামের জমা জলে নেমে স্নান করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, জল কতটা গভীর তা না জেনেই এবং এলাকার ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থেকেই তারা জলে নেমেছিল। স্নান করার সময় হঠাৎ করেই অনভিপ্রেতভাবে সুপ্রিয় গভীর জলের ঘূর্ণি বা তীব্র স্রোতের টানে তলে যেতে শুরু করে। নিজের জীবন বিপন্ন হতে দেখে সুপ্রিয় 'বাঁচাও বাঁচাও' বলে চিৎকার করে উঠলে সঙ্গে থাকা বন্ধুরা তাকে উদ্ধারের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালায়। কিন্তু জলাধারের নিচের তীব্র টান, পলিমাটি এবং অতিরিক্ত গভীরতার কারণে বন্ধুদের সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। চোখের পলকেই সুপ্রিয় জলের তলদেশে তলিয়ে যান এবং নিখোঁজ হন।
ঘটনার ভয়াবহতায় স্তব্ধ ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে বন্ধুরা। তাদের আর্তচিৎকার শুনে আশপাশের গ্রাম থেকে ছুটে আসেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দ্রুত খবর দেওয়া হয় নিকটবর্তী বারাবনি থানায়। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে খবর পাওয়া মাত্রই বারাবনি থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং বারাবনি ব্লকের বিডিও (BDO) সহ প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছান। নিখোঁজ ছাত্রের সন্ধানে তৎক্ষণাৎ স্থানীয় দক্ষ মৎস্যজীবী ও ডুবুরিদের সহায়তায় উদ্ধারকার্য শুরু করা হয়। তবে দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি চালানোর পরও সুপ্রিয়র কোনো হদিশ মেলেনি। এদিকে রাতের অন্ধকার নেমে আসায় এবং ড্যামের গভীর জলের প্রতিকূল পরিবেশ ও অন্ধকারের কারণে সাময়িকভাবে উদ্ধারকাজ স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় প্রশাসন। পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে, বিশেষ উদ্ধারকারী দল ও রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীকে (Disaster Management Group) খবর দেওয়া হয়েছে, যারা প্রথম আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই নতুন করে নিখোঁজ ছাত্রের খোঁজে পূর্ণাঙ্গ উদ্ধার অভিযান শুরু করবে।
এদিকে, স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক একটি তথ্য সামনে এসেছে। এলাকা সূত্রে খবর, ঠিক এর দু’দিন আগেই এই তরুণদের দলটি ওই একই জায়গায় সোশ্যাল মিডিয়ার জন্য 'রিল' (Reel) ও আকর্ষণীয় শর্ট ভিডিও বানাতে এসেছিল। সেদিনও তারা এখানে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটায়। এরপর ফের রবিবার তারা এখানে ঘুরতে আসে এবং শেষ পর্যন্ত এই মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে। বারাবনি এলাকার মন্দিরা ড্যামে প্রতি বছরই শীতে এবং ছুটির দিনগুলোতে প্রচুর মানুষ ও পর্যটক ঘুরতে আসেন। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, এই বিপজ্জনক জলাশয়টিতে যথাযথ নিরাপত্তা বেষ্টনী, গার্ডওয়াল বা কোনো সতর্কতামূলক নোটিশ বোর্ড না থাকায় প্রায়শই এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নেন কমবয়সী তরুণ-তরুণীরা। অনেক সময় স্যোশাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হওয়ার নেশায় জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কাল হয়ে দাঁড়চ্ছে। এই ঘটনার পর থেকে নিখোঁজ তরুণের পরিবার ও বন্ধু মহলে চরম শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একটি সম্ভাবনাময় তাজা প্রাণ এভাবে আকস্মিকভাবে বিপন্ন হওয়ায় বাকরুদ্ধ পুরো পরিবার এবং প্রতিবেশীরা। বারাবনি থানার পুলিশ সম্পূর্ণ ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে এবং বন্ধুদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সাধারণ মানুষকে এই ধরনের বিপজ্জনক স্থানে যাওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
ব্রেকিং নিউজ
রবিবারের ছুটির আনন্দ বিষাদ! বারাবনির মন্দিরা ড্যামের জলে স্নান করতে নেমে নিখোঁজ মেধাবী ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র

Nirbhik Bangla Photo
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
