আসানসোলে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের হানা, একাধিক হোটেল ও রেস্তোরাঁয় অনিয়মের অভিযোগ
আসানসোল, ২৮ আগস্ট: সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবন নিয়ে ছিনিছিনি খেলার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। আর সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই খাদ্যের গুণমান, সুরক্ষা ও কঠোর স্বাস্থ্যবিধি খতিয়ে দেখতে শুক্রবার আসানসোলের বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও নামী মিষ্টির দোকানে একযোগে অভিযান চালালেন খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা। এদিনের এই ঝটিকা অভিযানে জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের খাদ্য সুরক্ষা বিভাগের পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনও সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। শহরের প্রাণকেন্দ্র জিটি রোড সংলগ্ন এলাকা থেকে শুরু করে মহিষিলা, রেলপার ও বিভিন্ন জনবহুল বাজারের ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় দশটি হোটেল, রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানে এই কড়া নজরদারি চালানো হয়।
এদিনের এই আকস্মিক অভিযানে গিয়ে আধিকারিকদের নজরে আসে একের পর এক চাঞ্চল্যকর অনিয়ম। অনেক প্রতিষ্ঠানেই ছিল না রাজ্য বা কেন্দ্র সরকারের নির্ধারিত বৈধ ফুড লাইসেন্স। আবার কোথাও আইন মেনেই জলের লাইসেন্স বা জল পরীক্ষার রিপোর্ট সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি দেখাতে পারেননি মালিকপক্ষ। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বেশ কিছু মিষ্টির দোকানে দীর্ঘদিনের বাসি মিষ্টি এবং মেয়াদ উত্তীর্ণ ছানা ও দইয়ের প্যাকেট সরাসরি ফ্রিজে রেখে বিক্রির উদ্দেশ্যে মজুত করা হয়েছিল। এই সমস্ত খাদ্যে ছত্রাক ধরে যাওয়ায় তা জনস্বাস্থ্যের পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে দাবি করেছেন দপ্তরের আধিকারিকরা।
এছাড়াও, কয়েকটি হোটেলের রান্নাঘরের অন্দরের ছবি ছিল আরও ভয়াবহ। সম্পূর্ণ অপরিষ্কার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাঁচা মাংস খোলা অবস্থায় রাখা হয়েছিল। এমনকী, খোলা নর্দমার ঠিক পাশেই শাকসবজি ও মাংস সংরক্ষণের গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। হোটেলগুলিতে তৈরি বিরিয়ানি এবং বিভিন্ন মাংসের পদ তৈরিতে ঠিক কী ধরণের মশলা ব্যবহার করা হচ্ছে, রান্নার তেল কতবার ব্যবহার করা হচ্ছে, তাও খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা হয়। অভিযানে বেশ কিছু ভেজাল বা নিম্নমানের রঙ মেশানো মশলার গুণমান নিয়ে জোরালো প্রশ্ন ওঠে। স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কায় তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট হোটেল ও দোকান মালিকদের সেই সমস্ত ক্ষতিকারক খাদ্যসামগ্রী বাজোপ্ত করে অবিলম্বে মাটিতে পুঁতে নষ্ট করে ফেলার নির্দেশ দেন আধিকারিকরা।
তদন্তে নেমে আধিকারিকরা দেখতে পান, রান্নাঘর থেকে ডাইনিং—কোথাও নেই পর্যাপ্ত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ন্যূনতম ব্যবস্থা। শ্রমিক বা বাবুর্চিদের গ্লাভস বা হেডক্যাপ ব্যবহারের কোনো বালাই ছিল না। অনেক নামসর্বস্ব ও নামী-দামি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত দোকানেও ডাস্টবিনের মতো সাধারণ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি দেখে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন পরিদর্শকরা।
পরবর্তীতে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, আজকের এই অভিযানে যে সমস্ত গুরুতর অনিয়ম ও গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে, তার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। ইতিমধ্যেই প্রাথমিক স্তরে মৌখিকভাবে সতর্ক করার পাশাপাশি দোষী মালিকদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট ধারায় লিখিত নোটিশ পাঠানোর প্রক্রিয়াও শুরু করে দেওয়া হয়েছে। লাইসেন্স বাতিল করার মতো কড়া পদক্ষেপেরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, আসন্ন উৎসবের মরশুমের আগে একসঙ্গে শহরের একাধিক হোটেল, রেস্তোরাঁ ও মিষ্টির দোকানে খাদ্য সুরক্ষা দপ্তরের এই আকস্মিক ও কঠোর পদক্ষেপে ব্যবসায়ী মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। অনেক দোকানদারকে অভিযানের খবর পেয়ে তড়িঘড়ি দোকান বন্ধ করে চম্পট দিতেও দেখা যায়। তবে সচেতন সাধারণ নাগরিক ও ক্রেতারা প্রশাসনের এই উদ্যোগকে একবাক্যে সাধুবাদ জানিয়েছেন। খাদ্য সুরক্ষা দপ্তর সূত্রে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আগামী দিনেও এই ধরণের অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং মানুষের স্বাস্থ্যের সঙ্গে আপস কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। প্রশাসনের এই বার্তা এখন সমগ্র আসানসোল শিল্পাঞ্চলের খাদ্য ব্যবসায়ীদের মধ্যে বড়সড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
ব্রেকিং নিউজ
উৎসবের আগে আসানসোলে কড়া পদক্ষেপ, অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির অভিযোগে তোলপাড়

Nirbhik Bangla Photo
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
