আসানসোল, ২৭ আগস্ট: সমাজের প্রতিটি স্তরে নারীদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা, নারী ও শিশুদের উপর ক্রমবর্ধমান অপরাধ রোধ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইনি সচেতনতা ও অধিকারবোধ গড়ে তুলতে এক অভিনব ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করল পশ্চিম বর্ধমান জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষ (ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সার্ভিস অথরিটি)। সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, সচেতনতার বার্তা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পথনাটিকার সাহায্য নেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার আসানসোলের জনবহুল চত্বরে আয়োজিত এই পথনাটিকার মাধ্যমে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের কাছে নারী-পুরুষের সমান অধিকার এবং শিশু সুরক্ষার বার্তা অত্যন্ত সহজ ও জোরালো ভাষায় পৌঁছে দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ২৬ আগস্ট ছিল আন্তর্জাতিক 'ওম্যানস ইক্যুয়ালিটি ডে' বা নারী সমানাধিকার দিবস। কিন্তু ওই দিন সরকারি ছুটির দিন থাকায়, তার ঠিক পরের দিন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার এই তাৎপর্যপূর্ণ দিবসটিকে সামনে রেখেই এই বিশেষ সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
এদিনের পথনাটিকার মূল উপজীব্য বিষয় ছিল বর্তমান সমাজের বেশ কিছু গুরুতর ব্যাধি। নাটকের অভিনয়ের মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি বিস্তার রোধ, বাল্যবিবাহের মতো সমাজবিরোধী প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা, মেয়েদের উচ্চশিক্ষা ও পঠনপাঠনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার মতো কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তীব্র বার্তা দেওয়া হয়। পাশাপাশি, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত হওয়া বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে সাধারণ মানুষকে ওয়াকিবহাল করা হয় এবং কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ কীভাবে আইনি পথে করতে হবে, তার দিশা দেখানো হয়।
এই পুরো অনুষ্ঠান ও উদ্যোগের বিষয়ে বলতে গিয়ে আয়োজক তথা ডিস্ট্রিক্ট লিগ্যাল সার্ভিস অথরিটির সেক্রেটারি আম্রপালি চক্রবর্তী অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমানভাবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার রয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ের মধ্যে কোনো রকম বৈষম্য করা আইনত দণ্ডনীয় এবং অসাংবিধানিক। ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কারও জন্মগত অধিকার খর্ব করা উচিত নয়। আইনের এই মৌলিক ও শাশ্বত বার্তাই আকর্ষণীয় পথনাটিকার মাধ্যমে সাধারণ পথচলতি মানুষের কাছে তুলে ধরা হয়, যা উপস্থিত দর্শকদের দারুণভাবে প্রভাবিত করে।
আইনি সচেতনতার এই মহতী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিম বর্ধমান জেলার জেলা জজ, আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের পুলিশ কমিশনার, ডিসিপি (সেন্ট্রাল)-সহ জেলা প্রশাসন ও পুলিশ মহলের একাধিক শীর্ষ আধিকারিক। প্রশাসনিক শীর্ষকর্তাদের এই উপস্থিতি অনুষ্ঠানের গুরুত্ব ও গাম্ভীর্যকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল এর পরিবেশনা। জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের নিবেদিতপ্রাণ প্যারা-লিগ্যাল ভলান্টিয়াররা (PLV) অত্যন্ত নিপুণতার সঙ্গে পথনাটিকায় অংশ নেন। এছাড়া, একটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার শিশু ও কিশোর-কিশোরীরাও এই আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগদান করে, যা অনুষ্ঠানে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া সাধারণ মানুষ ও পথচারীরাও এই সচেতনতামূলক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং অনেকেই দাঁড়িয়ে পুরো নাটকটি উপভোগ করেন।
আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, জেলা আইনি পরিষেবা কর্তৃপক্ষের এই ধরনের উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো— আইন কেবল আদালতের চার দেওয়ালের মধ্যে বা নথিপত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের একেবারে তৃণমূল স্তরের সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আইনি অধিকার ও কর্তব্যের পাঠ সাধারণ মানুষ যত সহজে বুঝতে পারবেন, সমাজ থেকে অপরাধ তত দ্রুত হ্রাস পাবে। আগামী দিনেও পশ্চিম বর্ধমান জেলাজুড়ে এই ধরনের আরও জনসচেতনতামূলক ক্যাম্প ও কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে বলে আয়োজকদের তরফে জানানো হয়েছে।
পশ্চিম বর্ধমান
বাল্যবিবাহ ও পর্নোগ্রাফি রোধে আসানসোলে পথনাটিকা, উপস্থিত ছিলেন জেলা জজ ও পুলিশ কমিশনার

Nirbhik Bangla Photo
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
