শশ্যাম দাস, আসানসোল: ন্যূনতম মজুরির দাবিকে কেন্দ্র করে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে পশ্চিম বর্ধমান জেলার সালানপুর ব্লকের দেন্দুয়া শিল্পাঞ্চল। রাজ্য সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম দৈনিক মজুরি ৩৮৬ টাকা অবিলম্বে কার্যকর করার দাবিতে গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া শ্রমিক আন্দোলন সোমবার আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এদিনের ঘটনাপ্রবাহে কেবল সালানপুর নয়, পুরো আসানসোল শিল্পাঞ্চলে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
গত শনিবার সালানপুরের দেন্দুয়া এলাকার একটি বেসরকারি কারখানার গেটের সামনে কর্মবিরতি ঘোষণা করে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিক্ষোভে বসেছিলেন শ্রমিকরা। পরবর্তীতে এই আন্দোলনের প্রভাব গিয়ে পড়ে পার্শ্ববর্তী অন্যান্য কারখানাতেও। পরিস্থিতি সামাল দিতে রবিবার আসানসোলের স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের হস্তক্ষেপে এবং বিজেপির একটি প্রতিনিধি দলের মধ্যস্থতায় শ্রমিকদের সঙ্গে মালিকপক্ষের সমঝোতার চেষ্টা হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যে শ্রমিকরা স্বেচ্ছায় কাজে যোগ দিতে ইচ্ছুক, তাঁরা কারখানায় প্রবেশ করতে পারবেন। এই আলোচনার পর সাময়িকভাবে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও তা স্থায়ী হয়নি।
সোমবার সকাল থেকেই দেন্দুয়ার ওই শিল্প এলাকায় নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনরত শ্রমিকদের মূল অভিযোগ, কারখানা কর্তৃপক্ষ তাঁদের নায্য দাবি তো মানছেই না, উল্টো পথে হেঁটে নিজস্ব গাড়ির ব্যবস্থা করে বাইরে থেকে শ্রমিক এনে কারখানার ভেতরে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে। স্থানীয় শ্রমিকদের বাদ দিয়ে বহিরাগতদের দিয়ে কাজ করানোর এই সিদ্ধান্তেই ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে।
পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হওয়ায় সোমবার দুপুরে ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা দলবদ্ধভাবে আসানসোলে পশ্চিম বর্ধমান জেলাশাসকের (ডিএম) দপ্তরে উপস্থিত হন। সেখানে তাঁরা জেলাশাসকের কার্যালয় চত্বরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন এবং দীর্ঘক্ষণ ধরে তাদের নায্য দাবি আদায়ে স্লোগান দেন। এর ফলে ডিএম অফিস চত্বরে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
আন্দোলনকারী শ্রমিক নেতা অমর মাহাতো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, 'প্রশাসন ও মালিকপক্ষের মধ্যে আগামী বুধবার একটি ত্রিদলীয় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। আমরা অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে কারখানার গেটের বাইরে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু কারখানা কর্তৃপক্ষ সব নিয়ম ও সমঝোতা লঙ্ঘন করে বাইরে থেকে শ্রমিক এনে কাজ শুরু করায় শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে।' তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, 'কারখানার দূষণ, ধুলো-বালি ও কঠোর পরিশ্রম সহ্য করব আমরা স্থানীয় শ্রমিকরা, আর কাজের সুযোগ পাবে বাইরের লোকজন—এই কেমন নীতি?'
শ্রমিকদের আরও অভিযোগ, রাজ্য সরকারের স্পষ্ট নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও মালিকপক্ষ তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করছে। শুধু তাই নয়, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ বাহিনী শ্রমিকদের নায্য অধিকারের লড়াইয়ে পাশে না দাঁড়িয়ে পরোক্ষভাবে কারখানা কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করছে বলেও তাঁদের অভিযোগ। আন্দোলনকারীদের দাবি, কারখানার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রক্ষীরা তাঁদের সরাসরি হুমকি দিচ্ছে। কারখানার ভেতরে প্রবেশে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি বাইরে 'দেখে নেওয়ার' মতো ভয় দেখানো হচ্ছে। বাধ্য হয়েই তাঁরা আইনের আশ্রয় নিতে এবং প্রশাসনের উচ্চ পর্যায়ে স্মারক লিপি দিতে ডিএম অফিসে এসেছেন।
এই গণবিক্ষোভের জেরে বর্তমানে গোটা দেন্দুয়া শিল্পাঞ্চলে চরম থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। আন্দোলনরত শ্রমিকদের সাফ হুঁশিয়ারি, অবিলম্বে যদি রাজ্য সরকারের নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরি চালু না করা হয় এবং বহিরাগত দিয়ে কাজ করানোর নীতি বন্ধ না করা হয়, তবে দেন্দুয়া অঞ্চলের সমস্ত কারখানার শ্রমিকরা একজোট হয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে নামবেন এবং জেলাশাসকের দপ্তরের সামনে দীর্ঘমেয়াদী অবস্থান বিক্ষোভে বসবেন।
পশ্চিম বর্ধমান
ন্যূনতম মজুরির দাবিতে উত্তপ্ত আসানসোলের সালানপুর, ডিএম অফিসে শ্রমিকদের বিক্ষোভ

ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
