Nirbhik Bangla
ব্রেকিং নিউজ

আসানসোলে বৃষ্টির প্রকোপে ধসে গেল ৩ কোটির সড়ক, নেপথ্যে নিম্নমানের কাজ না ভূগর্ভস্থ খনি?

নির্ভীক বাংলা নিউজ ডেস্ক
নির্ভীক বাংলা নিউজ ডেস্ক
২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ এ ১১:৫০ AM
WhatsApp
আসানসোলে বৃষ্টির প্রকোপে ধসে গেল ৩ কোটির সড়ক, নেপথ্যে নিম্নমানের কাজ না ভূগর্ভস্থ খনি?
Nirbhik Bangla Photo
৩ কোটি টাকার PMGSY রাস্তা বৃষ্টিতে ধসে পড়ল, আসানসোলে উন্নয়ন কাজের মান নিয়ে উঠল প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিনিধি, আসানসোল: পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি গত দু’দিন ধরে আসানসোল ও গোটা পশ্চিম বর্ধমান জেলাজুড়ে দফায় দফায় প্রবল বর্ষণে জনজীবন কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। টানা বৃষ্টির জেরে নিচু এলাকাগুলিতে জল জমে চরম দুর্ভোগের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় নদী ও নালাগুলিও ফুলেফেঁপে উঠেছে, যার ফলে নদীতীরবর্তী অঞ্চলগুলিতে নতুন করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার বৃষ্টির জল ঢুকে পড়েছে সাধারণ মানুষের বসতবাড়িতেও। এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেই আসানসোল লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত বারাবনি বিধানসভার ভাস্কাজোড়ি থেকে সামনে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর ও উদ্বেগজনক ঘটনা।

জানা গিয়েছে, গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনা বা PMGSY-এর আওতায় নির্মিত প্রায় ৮০ ফুট দীর্ঘ একটি পিচ রাস্তার বিশাল অংশ সম্পূর্ণভাবে মাটিতে বসে গিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এই রাস্তাটি নির্মাণের এক বছরও এখনও পূর্ণ হয়নি। অথচ তার আগেই গত কয়েকদিনের প্রবল বৃষ্টির প্রকোপে রাস্তার একটি বিরাট অংশ হুড়মুড়িয়ে ধসে পড়ে।

স্থানীয় সাধারণ মানুষের তীব্র ক্ষোভ ও অভিযোগ, এই রাস্তাটি নির্মাণে প্রায় ৩ কোটি টাকা সরকারি অর্থ ব্যয় করা হয়েছিল। কিন্তু নির্মাণের এত অল্প সময়ের মধ্যে কোটি টাকার এই রাস্তা এভাবে বসে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে নির্মাণকাজের গুণমান এবং রাস্তা তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রযুক্তিগত পদ্ধতি নিয়ে।

কী কারণে ধসে পড়ল রাস্তা?
রাস্তার বিশাল অংশ আচমকা মাটিতে বসে যাওয়ার পর এখন সবচেয়ে বড় এবং জ্বলন্ত প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—কী কারণে এত অল্প সময়ের মধ্যে কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি রাস্তা এভাবে ধসে পড়ল? একটানা বৃষ্টি এবং রাস্তার ধারে জল জমে যাওয়াই কি এর একমাত্র কারণ, নাকি এর পেছনে অন্য কোনও গভীর গাফিলতি রয়েছে? এলাকাবাসীর মনে ঘুরপাক খাচ্ছে একাধিক প্রশ্ন:
১. রাস্তা তৈরিতে ব্যবহৃত পিচ, খোয়া ও অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর গুণমান কি আদৌ সঠিক ছিল?
২. নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড বা স্পেসিফিকেশন মেনেই কি রাস্তাটি নির্মাণ করা হয়েছিল?
৩. নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট ওই এলাকার মাটি এবং ভূপ্রকৃতির যথাযথ প্রযুক্তিগত সমীক্ষা করা হয়েছিল কি না?

এই সমস্ত যৌক্তিক প্রশ্ন ঘিরেই এখন স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে শুরু হয়েছে জোর রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনা।

ভূগর্ভস্থ কয়লা খনন নিয়েও বাড়ছে আশঙ্কা
যেহেতু ভাস্কাজোড়ি এলাকাটি ঐতিহ্যগতভাবেই একটি কয়লাঞ্চল হিসেবে পরিচিত, তাই রাস্তার নিচে সম্ভাব্য ভূগর্ভস্থ কয়লা খনন বা পুরনো পরিত্যক্ত কয়লখনিগুলির অস্তিত্ব নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলছেন সচেতন মহলের একাংশ। তাঁদের বক্তব্য, যদি ওই রাস্তার নিচে অতীতে অবৈধ বা বৈধভাবে ভূগর্ভস্থ কয়লা খনন করা হয়ে থাকে কিংবা মাটির নিচে অবৈজ্ঞানিক উপায়ে কোনও ফাঁকা জায়গা বা গহ্বর তৈরি হয়ে থাকে, তবে প্রবল বৃষ্টির জল চুঁইয়ে সেই মাটি বসে যাওয়ার আশঙ্কা কোনওভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তবে ভূগর্ভস্থ খননের কারণেই হুবহু এই দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না, সেই বিষয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও সরকারি বা প্রশাসনিক আধিকারিক নিশ্চিতভাবে কিছু জানাননি। প্রকৃত কারণ জানতে হলে অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী এবং ভূতাত্ত্বিকদের সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের প্রযুক্তিগত তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।

৩ কোটি টাকার সরকারি অর্থ ও সাধারণ মানুষের আস্থার সংকট
গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রী গ্রাম সড়ক যোজনার গুরুত্ব অপরিসীম। এই প্রকল্পের অধীনে কোটি কোটি টাকা খরচ করে ভাস্কাজোড়ির এই রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু নির্মাণের এক বছর অতিক্রান্ত না হতেই রাস্তার এই বেহাল দশা সরকারি কাজের স্বচ্ছতা ও গুণমানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। স্থানীয়দের জোরালো অভিযোগ, রাস্তা নির্মাণে যদি ইচ্ছাকৃতভাবে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়ে থাকে কিংবা কাজ শুরুর আগে এলাকার মাটি পরীক্ষার মতো প্রাথমিক দায়িত্ব পালন না করা হয়ে থাকে, তবে এর দায় সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার সংস্থা এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের নিতে হবে।

তদন্তেই উন্মোচিত হবে প্রকৃত সত্য
বর্তমান পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে সংশ্লিষ্ট পূর্ত বা গ্রামোন্নয়ন দফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিকদের দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা। রাস্তা ধসের কারণ উদ্ঘাটনে প্রয়োজন পুঙ্খানুপুঙ্খ প্রযুক্তিগত তদন্ত। রাস্তা নির্মাণে ব্যবহৃত সামগ্রীর ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, মাটির বহন ক্ষমতা বা লোড বেয়ারিং ক্যাপাসিটি, রাস্তার ভিত্তি বা বেস লেয়ারের স্থায়িত্ব, জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার ত্রুটি এবং ওই এলাকার ভূগর্ভস্থ কয়লাখননের ইতিহাস—প্রতিটি দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা দরকার।

কারণ, এই ঘটনা শুধু ৮০ ফুট রাস্তা বসে যাওয়ার বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে কোটি কোটি টাকার করদাতার অর্থ এবং প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার প্রশ্ন।

দ্রুত স্থায়ী সমাধানের দাবি
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি, রাস্তা নির্মাণ সংক্রান্ত সমস্ত টেন্ডার ও কাজের নথি প্রকাশ্যে এনে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক। কোন স্তরে গাফিলতি ছিল, তা খতিয়ে দেখে দোষীদের অবিলম্বে চিহ্নিত করতে হবে এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে, সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে অবিলম্বে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় এই রাস্তাটি মেরামত করে একটি স্থায়ী সমাধান সূত্র বের করার জোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা, যাতে আগামী দিনে বর্ষার মৌসুমে সাধারণ মানুষকে ফের এমন বিপর্যয়ের মুখে পড়তে না হয়।

সবমিলিয়ে, রাস্তা ধসে পড়ার নেপথ্যে প্রকৃত কারণ কী, তা একমাত্র প্রশাসনিক তদন্ত রিপোর্ট হাতে আসার পরেই পরিষ্কার হবে। তবে ভরা বর্ষায় প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত রাস্তা এভাবে বসে যাওয়ার ঘটনাটি যে আসানসোলের গ্রামীণ এলাকায় উন্নয়নমূলক কাজের গুণমানকে এক বিরাট প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাল, তা বলাই বাহুল্য।
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
নির্ভীক বাংলা নিউজ ডেস্ক
নির্ভীক বাংলা নিউজ ডেস্ক

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক, নির্ভীক বাংলা।

WhatsApp
১২ মন্তব্য