মাইথন ড্যামে ডিভিসির প্রস্তাবিত ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরুদ্ধে জনরোষ তুঙ্গে, ২২ মৌজার ৪০টি গ্রামের বাসিন্দাদের বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি
আসানসোল:
দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (ডিভিসি)-এর অন্তর্গত মাইথন জলাশয়ে প্রস্তাবিত 'ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প' (Floating Solar Project)-কে কেন্দ্র করে ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গ সীমান্ত এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও জনরোষ ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় আদিবাসী, মূলবাসী এবং মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের দাবি, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তাদের একমাত্র জীবিকা এবং স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। এরই প্রতিবাদে 'জল, জঙ্গল, জমি আমাদের অধিকার'— এই রণহুংকার তুলে কালীপাথর ময়দানে ২২টি মৌজার ৪০টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষ এক বিশাল প্রতিবাদী জনসভায় শামিল হন।
'দামোদর ভ্যালি বাস্তুহারা সংগ্রাম সমিতি' এবং 'ল মহল ও খেরওয়াল মহল'-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই মহাসভায় সোমবার সকাল থেকেই আশপাশের গ্রামগুলি থেকে আদিবাসী ও মূলবাসী মানুষ মিছিল করে আসতে শুরু করেন। হাতে দলীয় ব্যানার, ফেস্টুন এবং ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র নিয়ে সমবেত হওয়া হাজার হাজার মানুষের প্রতিবাদে কেঁপে ওঠে গোটা এলাকা।
ঐতিহাসিক বঞ্চনা ও বর্তমান সংকট:
জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে বক্তারা ডিভিসির বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক বঞ্চনার ক্ষোভ উগরে দেন। তাঁরা স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৫০-এর দশকে মাইথন ড্যাম নির্মাণের সময় হাজার হাজার একর উর্বর জমি ও ভিটেমাটি কেড়ে নিয়ে হাজার হাজার পরিবারকে গৃহহীন করা হয়েছিল। সেই সময় যে সমস্ত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল— যেমন উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং পরিবারের অন্তত একজন সদস্যের স্থায়ী চাকরি— তার অধিকাংশ আজও অধরা। বহু বাস্তুহারা পরিবার যুগের পর যুগ ধরে ন্যায়বিচারের আশায় আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
এখন ড্যামের অবশিষ্ট যেটুকু জলাশয় স্থানীয় মৎস্যজীবী ও বাসিন্দাদের জীবিকার একমাত্র উৎস হিসেবে টিকে রয়েছে, সেখানেও বৃহৎ কর্পোরেট স্বার্থে ভাসমান সৌর প্যানেল বসানোর চক্রান্ত শুরু হয়েছে। প্রতিবাদীদের মতে, হাজার হাজার একর জলাশয় সৌর প্যানেলে ঢেকে দিলে জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে, সূর্যালোক পৌঁছাবে না এবং ফলে জলজ উদ্ভিদ ও মাছের বংশবৃদ্ধি ব্যাহত হবে। এতে শুধু যে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হবে তা নয়, হাজার হাজার মৎস্যজীবী পরিবার এক লহমায় জীবিকাহীন হয়ে পড়বেন।
আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট বার্তা ও মূল দাবিসমূহ:
জনসভায় উপস্থিত নেতৃত্ব স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন, "আমাদের পূর্বপুরুষেরা ড্যামের জন্য জমি দিয়েছেন, কিন্তু আমরা আর আমাদের জল ও জলজ পরিবেশ কোনো কর্পোরেট সংস্থাকে দখল করতে দেব না। জীবন দেব, তবুও অধিকার ছাড়ব না।"
গ্রামবাসীদের প্রধান দাবিগুলি হলো:
১. মাইথন জলাশয়ে প্রস্তাবিত সমস্ত ফ্লোটিং সোলার প্রজেক্ট অবিলম্বে পুরোপুরি বাতিল করতে হবে।
২. ড্যাম নির্মাণের সময় থেকে ঝুলে থাকা বাস্তুহারা পরিবারগুলির পুনর্বাসন, বকেয়া ক্ষতিপূরণ এবং কর্মসংস্থানের দাবির দ্রুত সমাধান করতে হবে।
৩. জল, জঙ্গল ও জমির ওপর আদিবাসী এবং মূলবাসী সম্প্রদায়ের প্রথাগত ও ঐতিহ্যবাহী অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দিতে হবে এবং সেখানে কোনো বেআইনি হস্তক্ষেপ চলবে না।
নেতৃত্বের উপস্থিতি ও আগামী দিনের হুঁশিয়ারি:
এই সুবিশাল জনসভায় প্রধান বক্তা ও সংগঠক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দামোদর ভ্যালি বাস্তুহারা সংগ্রাম সমিতির সভাপতি বাসুদেব মাহাতো, প্রধান সমন্বয়ক সুরেশ সরেন, পরেশ মারান্ডি, রণজিত সরেন, আকবর আনসারি, বিপ্লব মারান্ডি, অজয় হেমব্রম, অশোক মুর্মু, সুজিত মারান্ডি, রোহিত মুর্মু, বংশী মারান্ডি এবং অমিত মুর্মু সহ অঞ্চলের বিশিষ্ট আদিবাসী ও সামাজিক আন্দোলনের প্রতিনিধিবৃন্দ।
সভার শেষভাগে ডিভিসি কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনকে চরম হুঁশিয়ারি দিয়ে জানানো হয় যে, যদি এই পরিবেশ-বিরোধী ও জীবিকা-বিরোধী প্রকল্প অবিলম্বে প্রত্যাহার না করা হয়, তবে আগামী দিনে ড্যাম ঘেরাও, ডিভিসি কার্যালয় অবরোধ সহ আরও কঠোর ও বৃহত্তর সংগ্রামের পথ বেছে নেওয়া হবে। এই আন্দোলনের দাবানল সমগ্র শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়বে বলে বক্তারা সতর্ক করে দেন।
পশ্চিম বর্ধমান
মাইথনে ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ঘিরে তুঙ্গে জনরোষ, ড্যাম ঘেরাওয়ের চরম হুঁশিয়ারি আন্দোলনকারীদের

Nirbhik Bangla Photo
ট্যাগসমূহ:Maithon news
