Nirbhik Bangla
ব্রেকিং নিউজ

সিএসআর ফান্ডে শহরের রূপায়ণ নিয়ে রাজনৈতিক তরজা: সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ কংগ্রেসের, জবাব মন্ত্রীর

নির্ভীক বাংলা নিউজ ডেস্ক
নির্ভীক বাংলা নিউজ ডেস্ক
১৫ অক্টোবর, ২০২৬ এ ১১:২৭ AM
WhatsApp
সিএসআর ফান্ডে শহরের রূপায়ণ নিয়ে রাজনৈতিক তরজা: সরকারি অর্থের অপচয়ের অভিযোগ কংগ্রেসের, জবাব মন্ত্রীর
Nirbhik Bangla Photo
নির্ভীক বাংলা বিশেষ প্রতিবেদন: দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা থেকে শুরু করে শিল্প শহর আসানসোল পর্যন্ত বিভিন্ন প্রধান সড়ক, সেতু এবং ফ্লাইওভারগুলোকে লাল, নীল, হলুদ ও বর্ণিল রঙে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এই নান্দনিক সৌন্দর্যায়ন প্রচেষ্টার মাঝেই সম্প্রতি বৃষ্টির পর রাস্তায় বাইক ও অন্যান্য দু’চাকার যান পিছলে যাওয়ার বেশ কিছু ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়ে। এই ঘটনাগুলোর পর থেকেই সাধারণ মানুষের মধ্যে শহরের পরিকাঠামো ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে কলকাতার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও ফ্লাইওভারের রঙিন আস্তরণ বা লেয়ার ঘষে তুলে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, যাতে গাড়ির চাকার ঘর্ষণ বা গ্রিপ পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। তবে এই গোটা বিষয়টিকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তরজা। বিরোধী দল কংগ্রেস এই ধরনের সৌন্দর্যায়নের পেছনে সরকারি অর্থের অপচয় এবং অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের অভিযোগ তুলেছে। অন্যদিকে, রাজ্য নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল পরিষ্কার ভাষায় জানিয়েছেন যে, এই সমস্ত কাজ কোনোভাবেই সরকারি কোষাগার বা সাধারণ মানুষের করের টাকায় হচ্ছে না, বরং সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি বা CSR তহবিলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

বৃষ্টির পর সড়কে বাইক পিছলে যাওয়ার দৃশ্য এবং তার পরবর্তী রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া নিয়ে আমাদের এই বিশেষ উপস্থাপনা।

ভাইরাল ভিডিও এবং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
উৎসবের মরসুমে শহরকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলার উদ্দেশ্যে কলকাতার গারিয়াহাট ব্রিজ, চিংড়িঘাটা ব্রিজ, রেড রোড এবং পার্ক সার্কাস কানেক্টরসহ বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় আল্পনা ও রঙিন নকশার কাজ করা হয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত টেকনিক্যাল মূল্যায়নের অভাব রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে লাগাতার বৃষ্টি ও তার ফলে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনাগুলো। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, বৃষ্টির পরপরই রঙিন রাস্তার আস্তরণে টায়ার স্কিড করার কারণে বেশ কয়েকজন বাইকচালক বিপদের মুখে পড়েছেন।

এই ঘটনার পর বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যে ধরনের পেইন্ট বা কেমিক্যালের ব্যবহার রাস্তার ওপর করা হয়েছে, তা বৃষ্টির জলে অতিরিক্ত পিচ্ছিল হয়ে যেতে পারে। যদিও এই দুর্ঘটনার একমাত্র কারণ রাস্তার রঙ কি না, তা নিয়ে এখনও স্বাধীন ও পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে, তবুও নিরাপত্তার খাতিরে প্রশাসন বসে নেই। ইতিমধ্যেই চিংড়িঘাটা এবং গারিয়াহাট ব্রিজের কিছু অংশে সড়ক পৃষ্ঠের উপরিভাগ ঘষে বা ক্র্যাপিং করে ঘর্ষণ ক্ষমতা বাড়ানোর কাজ শুরু হয়েছে।

কংগ্রেসের তোপ এবং জবাবদিহিতার দাবি
পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সদস্য প্রসেনজিৎ পোইতুণ্ডী এই ঘটনায় রাজ্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন। অতীতে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের জমানায় সরকারি ভবন ও সেতুগুলোতে নীল-সাদা রঙের আধিক্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বর্তমান সরকারের এই নতুন রঙ ব্যবহারের নীতিকে কটাক্ষ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি রঙ করার কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হয় এবং পরবর্তীতে সেই রঙ আবার খরচ করে তুলে ফেলতে হয়, তবে এই অপচয়ের দায় কে নেবে?

প্রনজিতবাবুর বক্তব্য, কাজটি CSR ফান্ড থেকে হলেও সেই অর্থও জনকল্যাণ বা পরিকাঠামো উন্নয়নের একটি বড় অংশ হতে পারত। কেন যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই রাস্তায় সরাসরি রঙ করা হলো এবং পরবর্তীতে তা আবার অপসারণের সিদ্ধান্ত নিতে হলো, তার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা উচিত। পুরো বিষয়টির নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছে কংগ্রেস নেতৃত্ব।

মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের সাফাই: সম্পূর্ণ কাজ হয়েছে CSR ফান্ডে
কংগ্রেস সহ অন্যান্য মহলের সমালোচনার জবাবে রাজ্যের নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই সৌন্দর্যায়নের কাজে সাধারণ মানুষের এক পয়সাও খরচ করা হয়নি। বিভিন্ন কর্পোরেট সংস্থার সিএসআর (CSR) তহবিলের মাধ্যমেই এই সমস্ত ব্যয়ভার বহন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, 'শহরকে সুন্দর রাখা নগরোন্নয়ন দপ্তরেরই অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। যেভাবে পানীয় জল সরবরাহ বা জঞ্জাল অপসারণ গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই শহরকে পরিচ্ছন্ন এবং নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তোলাও আমাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।' মন্ত্রী আরও জানান, গারিয়া-ঠাকুরপুকুর ব্রিজে আল্পনা আঁকার যে খবর ছড়িয়েছিল, তা সম্পূর্ণ সত্য নয়। তবে যেসব স্থানে বাণিজিক ও শিল্প সংস্থাগুলোর সহায়তায় এই কাজ হয়েছে, সেখানে জননিরাপত্তাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

ভাইরাল ভিডিও ও দুর্ঘটনার নেপথ্য কারণ
সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও প্রসঙ্গে মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানান, কেবল রঙের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া বা তড়িঘড়ি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তিনি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, কলকাতা থেকে ফেরার পথে তিনি জাতীয় হাসপাতালেও সড়ক দুর্ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন, যেখানে রাস্তার কোনো বিশেষ রঙ করা ছিল না। অতীতেও খারাপ রাস্তার কারণে বহু দুর্ঘটনা ঘটেছে।

তা সত্ত্বেও, জনস্বার্থ এবং মানুষের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে কলকাতা পুলিশ এবং কেএমডিএ (KMDA)-র প্রকৌশলীদের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত পদক্ষেপ করা হয়েছে। ব্রিজের ওপর যেখানেই পিচ্ছিল হওয়ার অভিযোগ এসেছে, সেখানে ইঞ্জিনিয়ারিং টিম পাঠিয়ে টেকনিক্যাল ত্রুটি সংশোধনের কাজ চলছে।

আসানসোল থেকে কলকাতা: রাজ্যজুড়ে সিএসআর ফান্ডের বহুমুখী ব্যবহার
কলকাতা ছাড়াও হাওড়া, শিলিগুড়ি এবং আসানসোলের মতো বড় শহরগুলোতেও সিএসআর ফান্ডের মাধ্যমে সৌন্দর্যায়নের বড় পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে রাজ্য সরকার। ক্রেডাই (CREDAI), ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমর্স, সিআইআই (CII), এবং বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্সের মতো প্রথম সারির শিল্প ও বাণিজ্য সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়েছে।

এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, শহরের প্রধান সড়কগুলোর ডিভাইডার গ্রিনারি তৈরি করা, ফ্লাইওভারের নিচের জঞ্জাল মুক্ত ও অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গাগুলোকে আলোকিত করা এবং শহরাঞ্চলের জলাশয়গুলোর আধুনিকীকরণ করা হবে।

ফ্লাইওভারের নিচে ইনডোর গেমসের পরিকাঠামো
নগরোন্নয়ন দপ্তরের নতুন এই ভাবনায় শহরবাসীর বিনোদনের জন্যও বিশেষ স্থান রাখা হয়েছে। মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল জানিয়েছেন, শহরের বিভিন্ন বড় ফ্লাইওভারের নিচে বর্তমানে যে অব্যবহৃত ও ফাঁকা জায়গাগুলো পড়ে থাকে, সেগুলোকে সুরক্ষিত এবং নান্দনিক করে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

এই স্থানগুলোতে টেবিল টেনিস, ক্যারম এবং চেসের মতো ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে ব্যস্ত কর্মজীবন শেষ করে সাধারণ মানুষ বা তরুণ প্রজন্ম এই সুবিধাগুলো উপভোগ করতে পারে। রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে কিছু ক্ষেত্রে ন্যূনতম মেম্বারশিপ ফি বা সদস্যপদ চালুর কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে।

উপসংহার
শহরকে বিশ্বমানের ও দৃষ্টিনন্দন করে তোলার সরকারি উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও, তা যেন কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের যাতায়াতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তার ঝুঁকি হয়ে না দাঁড়ায়—এমনটাই মত বিশেষজ্ঞদের। সৌন্দর্যায়ন এবং সড়ক নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেই নীতি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে এই প্রকল্পগুলোতে যাতে আরও বেশি বৈজ্ঞানিক ও প্রকৌশলগত মান বজায় রাখা হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
নির্ভীক বাংলা নিউজ ডেস্ক
নির্ভীক বাংলা নিউজ ডেস্ক

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক, নির্ভীক বাংলা।

WhatsApp
১২ মন্তব্য