শ্যাম দাস, আসানসোল: ‘তোলাবাজি করলে আমি বাঁচাতে পারবো না’— বার্নপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে দলের কর্মী ও কার্যকর্তাদের উদ্দেশ্যে এই কড়া বার্তা দিলেন রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। বিধানসভা নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে দলের দূরত্ব ঘোচাতে এবার অত্যন্ত কঠোর ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের পথে হাঁটছে নেতৃত্ব। সেই লক্ষ্যেই সোমবার বার্নপুরের ভারতী ভবনে নিজের বিধানসভা কেন্দ্র আসানসোল দক্ষিণের মণ্ডল স্তরের নেতা ও কর্মীদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের সাংগঠনিক বৈঠক করেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। এদিনের বৈঠকে মূল আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা, সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের সঠিক রূপায়ণ এবং দলীয় কর্মীদের সামাজিক দায়িত্ববোধ।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অগ্নিমিত্রা পাল জানান, নির্বাচনের ব্যস্ততা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পালাবদলের জেরে বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের সঙ্গে সেভাবে নিয়মিত সাংগঠনিক বৈঠক করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। তাই এবার দলের তৃণমূল স্তর পর্যন্ত সংগঠনের ভিত মজবুত করতে এবং প্রতিটি কর্মীর নির্দিষ্ট দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এলাকার সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ এবং সরকারি পরিষেবাগুলো সঠিকভাবে তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে এদিনের বৈঠকে।
এদিন কর্মীদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, শুধুমাত্র অফিসে বসে নয়, দলের প্রতিটি কর্মীকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাধারণ মানুষের সমস্যার কথা শুনতে হবে। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, যেমন অন্নপূর্ণা প্রকল্প বা অন্যান্য সাহায্য সাধারণ মানুষ ঠিকমতো পাচ্ছেন কি না, তা যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি, এলাকার পানীয় জলের সংকট, বেহাল রাস্তা, অপর্যাপ্ত পথবাতি কিংবা নিকাশি বা ড্রেনেজ ব্যবস্থার মতো মৌলিক সমস্যাগুলি চিহ্নিত করে দ্রুত তা প্রশাসনের নজরে আনার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। এছাড়াও স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং অন্যান্য সরকারি পরিষেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের কোনো ক্ষোভ বা সমস্যা থাকলে, তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নজরে এনে দ্রুত সমাধানের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে।
বৈঠকে পানীয় জল সরবরাহ, জঞ্জাল অপসারণ, নিকাশি এবং সড়ক পরিকাঠামোর মতো জনস্বাস্থ্য ও নাগরিক পরিষেবার বিষয়গুলিতে বিশেষ জোর দেওয়া হয়। সাধারণ মানুষের সঙ্গে দলের যোগাযোগ আরও নিবিড় ও সুদৃঢ় করতে স্থানীয় হাসপাতাল, থানা এবং অন্যান্য জরুরি পরিষেবার হেল্পলাইন বা নির্দিষ্ট প্রতিনিধিদের যোগাযোগের নম্বর বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার অভিনব পরামর্শ দেন অগ্নিমিত্রা পাল। এর ফলে সাধারণ মানুষ বিপদে পড়লে সহজেই প্রশাসনের সাহায্য পেতে পারবেন।
তবে এই সাংগঠনিক বৈঠকের সবথেকে বড় আকর্ষণ ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল তোলাবাজি ও বিভিন্ন বেআইনি কারবারের বিরুদ্ধে মন্ত্রীর দ্ব্যর্থহীন ও কঠোর হুশিয়ারি। মন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় দলীয় কর্মীদের জানিয়ে দেন, দলের নাম ভাঙিয়ে বা দলের ছায়ায় থেকে যদি কেউ কোনো ধরনের তোলাবাজি, সিন্ডিকেট বা বেআইনি কাজের সঙ্গে যুক্ত হন, তবে দল বা তিনি নিজে কাউকেই রক্ষা করতে এগিয়ে আসবেন না। প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে দল থেকে বহিষ্কারের মতো কঠোর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ করা হবে বলেও তিনি প্রকাশ্যেই সতর্ক করে দিয়েছেন।
শুধু রাজনৈতিক স্তরেই নয়, এলাকার সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা ও নাগরিক সুরক্ষার স্বার্থে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও প্রশাসনকে সক্রিয় হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন মন্ত্রী। এর মধ্যে রয়েছে যত্রতত্র গড়ে ওঠা বেআইনি নির্মাণ, জলাজমি ও জলাশয় ভরাট করা, অনুমোদনহীন লজ বা হোটেল পরিচালনা, ফায়ার লাইসেন্স বা অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা ছাড়া ব্যবসা চালানো এবং বেআইনি গোডাউন বা গুদামঘরের রমরমা। বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলের যে সমস্ত ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সংকীর্ণ রাস্তার কারণে অ্যাম্বুলেন্স বা দমকলের মতো জরুরি সেবার গাড়ি ঢুকতে পারে না, সেই সমস্ত বিপজ্জনক এলাকাগুলির সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে দ্রুত প্রশাসনকে জানানোর জন্য দলের কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষকেও এই বিষয়ে সচেতন করার জন্য আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
পরিশেষে, অগ্নিমিত্রা পাল বার্তা দিয়েছেন যে, সরকার, দলীয় কর্মী এবং সাধারণ মানুষ— এই ত্রিমুখী সমন্বয় এবং সহযোগিতার মাধ্যমেই কেবল এলাকার সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব। বার্নপুরের ভারতী ভবনের এই বৈঠক একদিকে যেমন দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক সমন্বয় জোরদার করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, তেমনই সাধারণ মানুষের সঙ্গে দলের নেতাকর্মীদের আচরণ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও এক স্পষ্ট ও আপসহীন রাজনৈতিক বার্তার নিদর্শন হয়ে রইল।
পশ্চিম বর্ধমান
দলের নাম ভাঙিয়ে বেআইনি কাজ নয়, কড়া দাওয়াই মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালের

Nirbhik Bangla Photo
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
