Nirbhik Bangla
লাইফস্টাইল

মায়ং: রহস্যময় তন্ত্রভূমি নাকি লোককথার জগৎ

আসামের ব্রহাম্প্ত্র নদীর তীরে অবস্থিত মরিগা জেলার একটি ছোট গ্রাম মায়ান, বহু শতাব্দী ধরে তার রহস্য, তান্ত্রিক অনুশীলন এবং লোককাহিনীর জন্য পরিচিত। জায়গাটি গুয়াহাটি থেকে প্রায় 40 কিলোমিটার দূরে।

Abdul Haque
Abdul Haque
৯ আগস্ট, ২০২৬ এ ০১:৩৬ AM
WhatsApp
মায়ং: রহস্যময় তন্ত্রভূমি নাকি লোককথার জগৎ
আসামের ব্রহাম্প্ত্র নদীর তীরে অবস্থিত মরিগা জেলার একটি ছোট গ্রাম মায়ান, বহু শতাব্দী ধরে তার রহস্য, তান্ত্রিক অনুশীলন এবং লোককাহিনীর জন্য পর|নির্ভীক বাংলা ফটো

অসমের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত মরিগাঁও জেলার ছোট্ট গ্রাম মায়ং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রহস্য, তন্ত্রসাধনা এবং লোককথার জন্য পরিচিত। গুয়াহাটি থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই স্থান দেশ-বিদেশের গবেষক, ইতিহাসবিদ, পর্যটক এবং আধ্যাত্মিক অন্বেষকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্র। অনেকেই মায়ংকে ‘ভারতের ব্ল্যাক ম্যাজিক ক্যাপিটাল’ বলে অভিহিত করেন, যদিও এর পরিচয়ের সঙ্গে যেমন ঐতিহাসিক সত্য জড়িয়ে আছে, তেমনই রয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তি ও জনশ্রুতি। মায়ং নামের উৎপত্তি নিয়ে বিভিন্ন মত প্রচলিত। একটি জনপ্রিয় ধারণা অনুযায়ী, নামটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘মায়া’ থেকে, যার অর্থ বিভ্রম, জাদু বা অলৌকিক শক্তি। আবার কিছু স্থানীয় জনজাতির মতে, ‘মিয়ং’ শব্দের অর্থ হাতি। অতীতে এই অঞ্চল ছিল বন্য হাতির বিচরণক্ষেত্র, তাই এই নামের সঙ্গেও মায়ংয়ের পরিচয় জড়িয়ে রয়েছে। স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, মায়ংয়ের ইতিহাসের সূত্র মহাভারতের যুগ পর্যন্ত পৌঁছায়। বিশ্বাস করা হয়, ভীম ও রাক্ষসী হিডিম্বার পুত্র ঘটোৎকচের সঙ্গে এই অঞ্চলের সম্পর্ক ছিল এবং কেউ কেউ তাঁকে মায়ংয়ের প্রাচীন শাসক হিসেবেও উল্লেখ করেন। আরও একটি প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী সতীর দেহাংশ এই অঞ্চলে পতিত হয়েছিল, যার ফলে স্থানটি বিশেষ আধ্যাত্মিক গুরুত্ব লাভ করে। প্রাচীনকাল থেকে মায়ং ছিল তন্ত্রসাধনা এবং লোকজ চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানকার ওঝা ও তান্ত্রিকরা ভেষজ, মন্ত্র এবং প্রাচীন লোকজ জ্ঞানের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা করতেন। সাপের কামড়, জ্বর এবং নানা শারীরিক সমস্যার চিকিৎসার জন্য দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসতেন। স্থানীয়দের দাবি, এই চিকিৎসা-জ্ঞান আজও মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে টিকে আছে। মায়ংয়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সম্পদ হল এখানকার প্রাচীন তান্ত্রিক পাণ্ডুলিপি। সংস্কৃত, অসমীয়া এবং অন্যান্য প্রাচীন ভাষায় লেখা এই পাণ্ডুলিপিগুলিতে মন্ত্র, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য এবং তান্ত্রিক সাধনার বিবরণ পাওয়া যায়। মায়ং সংগ্রহশালায় আজও বহু দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, তান্ত্রিক উপকরণ এবং ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে, যা গবেষকদের কাছে অত্যন্ত মূল্যবান। স্থানীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অতীতে মায়ংয়ের চারপাশ ছিল ঘন জঙ্গল ও পাহাড়ে ঘেরা। জনশ্রুতি রয়েছে, বিস্তীর্ণ বনাঞ্চলের মধ্যে গোপন সাধনাস্থল ও গুহা ছিল, যেখানে তান্ত্রিক সাধকেরা সাধনা করতেন। যদিও এই দাবিগুলির অধিকাংশই লোককথা ও জনবিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল, তবুও সেগুলি মায়ংয়ের রহস্যময় ভাবমূর্তিকে আজও জীবন্ত রেখেছে। এছাড়াও মায়ং অঞ্চলে অবস্থিত কয়েকটি প্রাচীন জলাশয় ও ধর্মীয় স্থান স্থানীয় মানুষের কাছে বিশেষভাবে পূজনীয়। অনেকের মতে, এখানে ভগবান শিব, দেবী পার্বতী এবং ভগবান গণেশের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাচীন মূর্তি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে। এসব স্থানে আজও ভক্তরা দর্শন ও পূজার জন্য সমবেত হন। মায়ংকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত কিংবদন্তিগুলির মধ্যে রয়েছে নরবলি সংক্রান্ত গল্প। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, প্রাচীনকালে কিছু বিশেষ আচার-অনুষ্ঠানে নরবলি দেওয়া হতো। তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এসব কাহিনির পক্ষে প্রামাণ্য তথ্য খুবই সীমিত এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বহু অতিরঞ্জিত উপাদান এতে যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে এমন কোনও প্রথার অস্তিত্ব নেই এবং মায়ং একটি স্বাভাবিক সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনযাপনের অংশ। রহস্য, ইতিহাস এবং আস্থার এক অনন্য মেলবন্ধন হিসেবে মায়ং আজ ভারতের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন ও গবেষণাকেন্দ্র। এখানে আগত দর্শনার্থীরা শুধু তন্ত্র-মন্ত্রের কাহিনি জানতেই আসেন না, বরং অসমের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, লোকসংস্কৃতি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যেরও স্বাদ গ্রহণ করেন। আধুনিকতার ছোঁয়া মায়ংয়ে পৌঁছালেও এর অলিগলি, মন্দির, বনাঞ্চল এবং লোককথার ভাঁজে আজও অতীতের রহস্যময় প্রতিধ্বনি শোনা যায়। তন্ত্রসাধনা, লোকবিশ্বাস, ইতিহাস এবং পৌরাণিক কাহিনির এই অনন্য সংমিশ্রণই মায়ংকে ভারতের অন্যতম রহস্যময় স্থান হিসেবে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। তাই প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক, গবেষক এবং আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানী এই বিস্ময়কর ভূমির টানে এখানে ছুটে আসেন, যেখানে ইতিহাস ও রহস্য আজও পাশাপাশি বেঁচে আছে।

Abdul Haque
Abdul Haque

প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক, নির্ভীক বাংলা।

WhatsApp
১২ মন্তব্য
মায়ং: রহস্যময় তন্ত্রভূমি নাকি লোককথার জগৎ | নির্ভীক বাংলা | নির্ভীক বাংলা