পেট্রলের পর এবার কি তবে হেলমেট ছাড়া মদও মিলবে না? আসানসোলে মদের দোকানের বাইরে ‘নো হেলমেট, নো লিকার’ বা হেলমেট না থাকলে মদ মিলবে না—এমন লেখা একটি বোর্ডকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে। রাজ্যের শিল্পাঞ্চলে সড়ক নিরাপত্তা বাড়াতে এবং দুর্ঘটনা কমাতে প্রশাসন একের পর এক কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ঠিক এই আবহেই আসানসোল নর্থ থানার অন্তর্গত বড়ুয়া বাজারের শান্তি হোটেলের একটি অফ-শপের বাইরে এই অভিনব ও বিতর্কিত বোর্ডটি টাঙানো হয়।
বোর্ডটি নজরে আসতেই স্থানীয় সাধারণ মানুষ এবং ক্রেতাদের মধ্যে নানা প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। অনেকেরই প্রশ্ন, মদ কেনার সঙ্গে মাথা সুরক্ষার হেলমেট পরার আইনি বা সামাজিক সম্পর্ক কোথায়? তাহলে কি এবার সরাসরি মদের দোকানেও ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হলো? সাধারণ মানুষের পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক মহলেও এই ঘটনা নিয়ে শুরু হয়েছে জোর চর্চা।
উল্লেখ্য, গত কিছু সময় ধরে পশ্চিমবঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা ও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশি কড়াকড়ি বহুগুণ বেড়েছে। হেলমেটবিহীন বাইক চালক, বিনা লাইসেন্সে গাড়ি চালানো এবং বিশেষ করে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নিচ্ছে প্রশাসন। আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে পথ নিরাপত্তা সচেতনতা শিবির এবং লাগাতার চেকিং অভিযান চালানো হয়। এর আগে রাজ্যজুড়ে পেট্রোল পাম্পগুলিতে ‘নো হেলমেট, নো পেট্রোল’ বা হেলমেট ছাড়া পেট্রোল দেওয়া হবে না—এই নিয়মটি বেশ কড়াকড়িভাবে কার্যকর করা হয়েছিল, যার ফলে বহুলাংশে হেলমেট ব্যবহারের প্রবণতা বৃদ্ধিও পেয়েছিল।
কিন্তু পেট্রোল পাম্পের সেই চেনা চিত্রের পর এবার মদের দোকানের সামনে ‘নো হেলমেট, নো লিকার’ লেখা সাইনবোর্ড নতুন করে আলোচনার ঝড় তুলেছে। তবে এই গোটা বিষয়ের নেপথ্যে রয়েছে এক ধোঁয়াশা। দোকান পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দাবি, এই বোর্ডটি তাঁদের নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি করা হয়নি। বরং তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেই এই বোর্ডটি তাঁদের হাতে দেওয়া হয়েছে এবং দোকানে রাখতে বলা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রশ্ন উঠলে আবগারি বা এক্সাইজ দফতরের ভূমিকা নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। দোকানদারদের দাবি, এই বিষয়ে রাজ্য আবগারি দফতর থেকে তাঁদের কাছে কোনওরকম সরকারি বা লিখিত নির্দেশিকা এসে পৌঁছায়নি।
সরকারি লিখিত নির্দেশ ছাড়াই পুলিশের মৌখিক বা প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপে এই বোর্ড টানানো হয়েছে কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়। সম্ভবত সেই কারণেই বোর্ডটি দোকানের ভিতরে বা স্থায়ীভাবে টানানো হয়নি, বরং দোকানের বাইরে রাখা হয়েছে। এর ফলে আরও জোরালো হয়েছে আইনি বৈধতার প্রশ্ন। মদ বিক্রেতারা উভয় সংকটে পড়েছেন—পুলিশের নির্দেশ অমান্য করাও কঠিন, আবার আবগারি দফতরের লিখিত নির্দেশ ছাড়া এই নিয়ম বলবৎ করা কতদূর আইনসম্মত, তা নিয়ে তাঁরা চিন্তিত।
এই ঘটনার জেরে মদ কিনতে আসা ক্রেতাদের মধ্যেও দেখা গেছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেকেই এই উদ্যোগকে সড়ক দুর্ঘটনারোধে একটি ইতিবাচক ও কঠোর পদক্ষেপ বলে সাধুবাদ জানাচ্ছেন, কারণ অনেকেই মদ খেয়ে বাইক চালিয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন। আবার অন্য একটি অংশের মতে, মদ বিক্রির সঙ্গে হেলমেটের শর্ত জুড়ে দেওয়া আইনি নিয়মের বাইরে গিয়ে একপ্রকার বাড়াবাড়ি।
সবমিলিয়ে, পেট্রল পাম্পের গণ্ডি পেরিয়ে এবার কি মদের দোকানেও কড়া নজরদারি চালাতে চলেছে পুলিশ? হেলমেট ছাড়া মদ না দেওয়ার এই নির্দেশ কি নিছকই সচেতনতামূলক নাকি এর পিছনে রয়েছে বড় কোনো প্রশাসনিক কৌশল? এই বিষয়ে আসানসোল পুলিশ কমিশনারেট এবং জেলা আবগারি দফতরের পক্ষ থেকে এখনও পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আসানসোলের বড়ুয়া বাজার এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং রাজ্যজুড়ে অন্যান্য মদের দোকানেও ভবিষ্যতে এমন নিয়ম চালু হতে পারে কি না, সেদিকেই এখন নজর সকলের।
খেলা
পেট্রল পাম্পের পথেই কি মদের দোকান? আসানসোলে নতুন নির্দেশিকা নিয়ে ধোঁয়াশা

