অপরাধ
আসানসোলে রাতের অন্ধকারে জাতীয় সড়কে চলল গুলি, চরম নিরাপত্তাহীনতায় সাধারণ মানুষ

Nirbhik Bangla Photo
জাতীয় সড়ক-১৯ (এনএইচ-১৯) বরাবরই দেশের অর্থনৈতিক গতিপ্রকৃতির এক অন্যতম প্রধান ধমনী। একদিকে যেখানে দিনরাত ছুটছে পণ্যবাহী লরি, দূরপাল্লার বাস এবং বিভিন্ন যানবাহনের সারি, যা দেশের বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সচল রাখে; অন্যদিকে ঠিক তার পাশেই প্রতিদিনের জীবিকা নির্বাহের তাগিদে রাতের অন্ধকারে ডিউটিতে বের হন বহু সাধারণ কর্মী। কিন্তু এই ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সড়কেই যদি রাতের নামার সঙ্গে সঙ্গে নেমে আসে ত্রাসের রাজত্ব, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দায়িত্ব কার কাঁধে বর্তায়? সম্প্রতি ডিপিএস (দিল্লি পাবলিক স্কুল) সংলগ্ন এলাকায় এক নৈশপ্রহরী বা কর্মীকে গুলি করার রোমহর্ষক ঘটনা এই প্রশ্নটিকেই ফের অত্যন্ত জোরালোভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। ছিনতাইয়ের মতো গুরুতর অপরাধমূলক ঘটনা রুখতে গিয়ে যেভাবে এক কর্মরত নাগরিকের ওপর প্রকাশ্যেই আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার করা হলো, তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধের ঘটনা নয়, বরং গোটা এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এক ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। ঘটনার বিবরণে জানা যায়, সালানপুর থানার অন্তর্গত আল্লাডি পঞ্চায়েতের ধাগুড়ির বাসিন্দা হরিদাস লায়ক (৪৩) প্রতিদিনের মতো নিজের রুটিন অনুযায়ী বাইকে চেপে আসানসোলের শ্রীহরি গ্লোবাল স্কুলে নৈশ ডিউটিতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সেই পরিচিত যাত্রাপথই যে এমন এক ভয়াল রূপ নিতে পারে, তা হয়তো তিনি ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি। সালানপুরের দিল্লি পাবলিক স্কুলের নিকটবর্তী এলাকায় পৌঁছতেই তাঁর পথ আটকানোর চেষ্টা করে একটি বাইকে সওয়ার তিন জন মুখোশধারী দুষ্কৃতী। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি বুঝে ওঠার আগেই হরিদাসের কাছ থেকে তাঁর মূল্যবান সামগ্রী ও ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে ওই অপরাধীরা। তবে হরিদাস কেবল একজন সাধারণ কর্মীই নন, তাঁর সততা ও সাহসিকতা ছিল প্রশংসনীয়। তিনি দুষ্কৃতীদের এই অনৈতিক কাজের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং সর্বশক্তি দিয়ে ছিনতাইয়ের চেষ্টা প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। আর ঠিক তখনই ঘটে চরম বিপত্তি। বাধা পেয়ে মুহূর্তের মধ্যে হিংস্র হয়ে ওঠে দুষ্কৃতীরা। অভিযোগ, হরিদাসকে লক্ষ্য করে পরপর দু’টি গুলি চালায় তারা। এর মধ্যে একটি গুলি সরাসরি তাঁর পায়ে লাগে এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। সাধারণত এমন আকস্মিক পরিস্থিতিতে যে কোনো মানুষেরই মনোবল ভেঙে যাওয়ার কথা। কিন্তু হরিদাস লায়ক এক অনন্য সাহসের পরিচয় দেন। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও তিনি ঘাবড়ে যাননি। মাটিতে লুটিয়ে থাকা অবস্থাতেই তিনি হামলাকারীদের মোবাইল ফোনে ভিডিয়ো বন্দি করার চেষ্টা করেন, যাতে ভবিষ্যতে অপরাধীদের সহজেই চিহ্নিত করা যায়। তাঁর এই অপ্রত্যাশিত এবং সাহসী প্রতিরোধ দেখে ঘাবড়ে যায় দুষ্কৃতীরাও। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় এলাকার পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে এবং হরিদাসকে পুরোপুরি ঘায়েল করতে না পেরে ঘটনাস্থল থেকে চম্পট দেয় অভিযুক্তেরা। এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় তীব্র চাঞ্চল্য ও গভীর আতঙ্ক ছড়ায়। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে সালানপুর থানার পুলিশ বাহিনী। রক্তাক্ত ও যন্ত্রণায় ছটফট করা হরিদাস লায়ককে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় ইএসআই হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর আঘাত গুরুতর হলেও বর্তমানে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে আছেন। ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছে তল্লাশি চালায় এবং সেখান থেকে একটি ব্যবহৃত কার্তুজের খোল উদ্ধার করে, যা প্রমাণ করে যে দুষ্কৃতীরা কতটা বেপরোয়া এবং পেশাদার অস্ত্রধারী ছিল। এই ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে তৎপর হয়েছে আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেট। ঘটনার পরই সংশ্লিষ্ট এলাকায় শুরু হয়েছে ব্যাপক নাকা-চেকিং, জোরদার তল্লাশি অভিযান এবং এলাকার সমস্ত সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখার কাজ। অপরাধীদের দ্রুত পাকড়াও করতে মাঠে নেমেছেন শীর্ষ পুলিশ কর্তারা স্বয়ং। পুলিশ কমিশনার ডঃ প্রণব কুমার, ডিসি ওয়েস্ট সানা আখতার, ডিসি সেন্ট্রাল ধ্রুব দাস-সহ অন্যান্য পদস্থ আধিকারিকেরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং পুরো ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত শুরু করেছেন। তবে এই ঘটনার পর থেকেই জনমনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে, তা হলো—জাতীয় সড়কের মতো এমন একটি ব্যস্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যদি রাতের অন্ধকারে অস্ত্র উঁচিয়ে দুষ্কৃতীরা দিরে বেড়ায়, তবে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার পাহারা আসলে কোথায়? শিল্পাঞ্চল এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকার নৈশ প্রহরীরা, কিংবা যারা রাতের শিফটে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত করেন, তারা কি তবে এভাবেই চরম ঝুঁকির মুখে রাস্তায় বেরোবেন? পুলিশের টহলদারি এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ফাঁক গলে কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে এখন চলছে তীব্র জল্পনা। স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানানোর পাশাপাশি জাতীয় সড়কে রাতের নিরাপত্তা আরও সুদৃঢ় করার জোরালো দাবি তুলেছেন।
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
