আসানসোলের ঐতিহ্যবাহী ও সুপরিচিত গান্ধীনার পূজা কমিটির ৪৬তম দুর্গোৎসব এবার এক অনন্যসাধারণ এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ থিমের মাধ্যমে সমগ্র অঞ্চলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ‘জন্ম, জীবন এবং মৃত্যু’—এই দার্শনিক ভাবনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি প্রায় ৭৫ লক্ষ টাকার ব্যয়বহুল ও সুদৃশ্য এই মণ্ডপটি দেখতে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে হাজার হাজার দর্শনার্থীর ঢল নামছে। এই বিশাল আয়োজনে একদিকে যেমন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে রাজস্থানের বর্ণিল সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী লোকশিল্প এবং সুদৃশ্য পুতুল নাচ, অন্যদিকে তেমনি মানবজীবনের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর সত্যকে অত্যন্ত শৈল্পিক ও মনস্তাত্ত্বিক কায়দায় তুলে ধরা হয়েছে, যা শিল্পরসিকদের মনে গভীর রেখাপাত করছে।
পূজা কমিটির অন্যতম প্রধান আয়োজক সোমিকা তিওয়ারি উপাধ্যায় জানান যে, এ বছরের মূল থিমের উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষকে মানবজীবনের একেবারে গোড়া অর্থাৎ জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে কর্মমুখর জীবন, আধ্যাত্মিকতা এবং অবশেষে মোক্ষলাভ বা চিরশান্তির পথ পর্যন্ত একটি অলৌকিক ও বাস্তবসম্মত যাত্রার সঙ্গে পরিচয় করানো। মণ্ডপের প্রতিটি কোণায় জীবনের একেকটি সুনির্দিষ্ট অধ্যায়কে অত্যন্ত নিখুঁত ও রূপক অর্থে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা কেবল চোখ জুড়ানোই নয়, বরং দর্শনার্থীদের মনে এক গভীর ভাবনার উদ্রেক করছে এবং জীবনের মানে নতুন করে খুঁজতে বাধ্য করছে।
পণ্ডালের প্রাথমিক অংশটিতে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মানবজীবনের সেই দুরন্ত ও উদ্যম সময়কে, যখন মানুষ তার শারীরিক ও মানসিক শক্তির শিখরে অবস্থান করে। যৌবনের এই পর্যায়ে মানুষের মনে অর্থ উপার্জনের প্রবল স্পৃহা, সমাজ বা কর্মক্ষেত্রে নাম ও যশ অর্জনের লালসা, একধরনের অহংকার এবং অদম্য উৎসাহ কাজ করে। আয়োজকদের মতে, জীবনের এই পর্বে মানুষ বস্তুগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকেই নিজের সর্বস্ব বলে মনে করে এবং নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনকেই জীবনের মূল লক্ষ্য করে নেয়। পণ্ডালের কারুশিল্পে এই অবস্থাকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে রূপায়িত করা হয়েছে, যা আমাদের অতি পরিচিত বাস্তবতারই এক শৈল্পিক প্রতিচ্ছবি।
তবে জীবন থেমে থাকে না। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও এক সুদূরপ্রসারী বদল আসে। পণ্ডালের পরবর্তী অংশে এই পরিবর্তনের কথা অত্যন্ত সুচারুভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সোমিকা তিওয়ারি উপাধ্যায়ের কথায়, সাধারণত মানুষের বয়স যখন ৩৫ থেকে ৪৫ বছরের কোঠায় পৌঁছায়, তখন জাগতিক মোহের বাইরে গিয়ে তার মন কিছুটা শান্ত হতে শুরু করে। বাহ্যিক কোলাহল ও ভোগবাদের জীবন থেকে সরে এসে মানুষ তখন আত্মচিন্তন, ঈশ্বরের আরাধনা এবং ত্যাগের মহিমার দিকে ঝুঁকে পড়ে। পণ্ডালের এই অংশে এই আধ্যাত্মিক উত্তরণকেই দৃশ্যমান করা হয়েছে, যেখানে মানুষ বস্তুগত অর্জনের চেয়ে মানসিক শান্তি এবং আত্মিক মুক্তির সন্ধান বেশি করে।
এই দর্শনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং মনোগ্রাহী অংশটি হলো ‘মন্নতের কুয়া’। এখানে সাধারণ মানুষের অগাধ বিশ্বাস, আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং মনের গোপন প্রার্থনাগুলোকে প্রতীকী রূপ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি হিংসা, রাগ, লোভ, মোহ এবং জাগতিক সমস্ত আকর্ষণকে ঝেড়ে ফেলে চিরন্তন মুক্তি বা মোক্ষের দিকে এগিয়ে যাওয়ার শাশ্বত বার্তা দেওয়া হয়েছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই দীর্ঘ ও চক্রাকার পথচলাই মানুষের জীবন, যা প্রতিটি মানুষকে এক গভীর আত্মোপলব্ধির সুযোগ করে দেয় এবং জীবনের নশ্বরতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।
শুধু দর্শনীয় দিক থেকেই নয়, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার দিক থেকেও গান্ধীনার পূজা কমিটি অত্যন্ত মুন্সিয়ানা দেখিয়েছে। গোটা পণ্ডাল চত্বরটি কঠোর সিসিটিভি ক্যামেরার নিখুঁত নজরদারিতে রাখা হয়েছে যাতে যেকোনো অনভিপ্রেত পরিস্থিতি এড়ানো যায়। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ কমিশনারেটের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখে এবং তাদের সমস্ত নির্দেশিকা অক্ষরে অক্ষরে মেনে এই বিশাল আয়োজন সম্পন্ন করা হয়। উৎসবের কদিন যাতে কোনো রকম অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে এবং সাধারণ মানুষ সম্পূর্ণ শান্তিতে ও স্বস্তিতে মা দুর্গার দর্শন লাভ করতে পারে, সেদিকে বিশেষ ও কঠোর নজর দেওয়া হয়।
এই পুজোর আরেকটি বিশেষ ও প্রসংশনীয় দিক হলো এতে নারীদের সক্রিয় ও অগ্রণী ভূমিকা। সোমিকা তিওয়ারি উপাধ্যায় গর্বের সঙ্গে জানান যে, এই কমিটির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও সমানভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। স্বেচ্ছাসেবী থেকে শুরু করে ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন গুরুদায়িত্ব তরুণী ও নারীরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে পালন করছেন। দেবীপক্ষের এই পবিত্র উৎসবে নারী শক্তির এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অনুষ্ঠানটিকে আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ ও অর্থবহ করে তুলেছে।
সোমিকা দেবী এবং তাঁর স্বামী রাহুল উপাধ্যায়ের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও নিরলস পরিশ্রমে গান্ধীনার পূজা কমিটির এই আয়োজন প্রতি বছরই নতুন উচ্চতা স্পর্শ করছে। মূলত সারা বছর ধরে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, পণ্ডালের নকশা তৈরি, বাজেট বরাদ্দ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা মাথায় রেখেই এই মহোৎসবের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। ৪৬ বছরে পদার্পণ করা এই দুর্গোৎসব আজ কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা আনন্দ উৎসব নয়, বরং শিল্প, সংস্কৃতি, দর্শন এবং জীবনবোধের এক অপূর্ব ও অবিস্মরণীয় মেলবন্ধন হিসেবে আসানসোলের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে এক স্থায়ী ও গৌরবোজ্জ্বল জায়গা করে নিয়েছে।
বিনোদন
জীবনদর্শন থেকে মোক্ষলাভ: আসানসোলের ৪৬তম গান্ধী নগর দুর্গোৎসবে থিমের বিরাট চমক

Nirbhik Bangla Photo
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
