মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে দেন্দুয়ায় উত্তপ্ত এলকুইন্ট ও রামদূত স্টিল প্লান্ট, ২৪ ঘণ্টা পেরিয়েও অব্যাহত বিক্ষোভ:
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম দৈনিক মজুরি ৩৮৬ টাকা অবিলম্বে চালুর দাবিতে আসানসোলের শিল্পাঞ্চল সালানপুর ব্লকের দেন্দুয়া এলাকায় শ্রমিক আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় অতিক্রান্ত হলেও এলকুইন্ট স্টিল প্লান্টের প্রধান গেটের সামনে শ্রমিকদের এই স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ এখনও অব্যাহত রয়েছে। সময় গড়ার সঙ্গে সঙ্গে কারখানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ এবং বাইরের চত্বরে উত্তেজনা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
বিক্ষোভ চলাকালীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে উপস্থিত পুলিশ প্রশাসন এবং কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের দফায় দফায় উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা ও সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হয়। এই জটিল পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের নায্য দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করে এবং তাদের পাশে দাঁড়াতে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সালানপুর ব্লকের স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব। তারা কারখানার উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় বসলেও দীর্ঘক্ষণ আলোচনা সত্ত্বেও কোনো সদর্থক সুরাহা বা সমাধানসূত্র মেলেনি।
পরিস্থিতি সম্পর্কে সালানপুর মণ্ডল-৪-এর সভাপতি চিন্ময় তেওয়ারী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, সালানপুর ব্লকের সমস্ত কারখানার শ্রমিক সংগঠনগুলির সঙ্গে সামগ্রিক বেতন কাঠামো নিয়ে যৌথভাবে আলোচনা করার অজুহাত দিয়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ সময় চাইছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত শ্রমিকরা আর কালক্ষেপণ করতে নারাজ। এমতাবস্থায় যতদিন না পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ সুনির্দিষ্ট ঘোষণা করছে, ততদিন শ্রমিকরা তাদের এই আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে চালিয়ে যাবেন বলে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন।
শ্রমিকদের প্রধান ও নায্য দাবি হলো, রাজ্য সরকারের শ্রম দফতরের নির্দেশিকা অনুযায়ী অবিলম্বে দৈনিক ৩৮৬ টাকা ন্যূনতম মজুরি চালু করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে নির্মম বাস্তব হলো, এই আইনের তোয়াক্কা না করে শ্রমিকদের হাতে ধরানো হচ্ছে মাত্র ৩২৩ টাকা। বিগত তিন মাস ধরে বকেয়া নায্য হাজিরা, আইনসম্মত সুযোগ-সুবিধা এবং মৌলিক শ্রমিক সুরক্ষার দাবিতে তাঁরা দফায় দফায় প্রতিবাদ জানিয়ে আসছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় বাধ্য হয়েই তাঁরা গতকাল থেকে অনশন ও না খেয়ে কারখানা চত্বরে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান বিক্ষোভে বসেছেন। নিজেদের নায্য দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন থেকে একচুলও নড়বেন না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তাঁরা।
আন্দোলনরত শ্রমিক নেতা অমর মাহাতো কারখানা কর্তৃপক্ষের তীব্র জনবিরোধী ও বেআইনি ভূমিকার বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন। তিনি জোরালো অভিযোগ করে বলেন, কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যেই রাজ্য সরকারের শ্রম নির্দেশিকা অমান্য করে একপ্রকার বেআইনি ও সরকারবিরোধী কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ঠিক কার অদৃশ্য ইন্ধনে এবং কার সাহসে কর্তৃপক্ষ সরকারিভাবে ধার্য করা ন্যূনতম মজুরি দিতে সরাসরি অস্বীকার করছে? পাশাপাশি তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, অনশনরত কোনো শ্রমিকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে বা কোনো ধরনের অনভিপ্রেত অঘটন ঘটলে তার সম্পূর্ণ দায়ভার একশো শতাংশ কারখানা কর্তৃপক্ষকেই নিতে হবে।
এদিকে, দেন্দুয়ায় এলকুইন্ট স্টিল কারখানার এই তীব্র আন্দোলনের আঁচ দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলিতেও। একই নায্য দাবিতে সংহতি জানিয়ে পার্শ্ববর্তী রামদূত কারখানার শ্রমিকরাও আকস্মিকভাবে কাজ বন্ধ করে কারখানার মূল গেটের সামনে আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। জোড়া কারখানার এই নজিরবিহীন যৌথ বিক্ষোভে সমগ্র সালানপুর শিল্পাঞ্চল জুড়ে চরম রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পাঞ্চলের অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে শ্রমিক অসন্তোষ মেটাতে শেষ পর্যন্ত জেলা প্রশাসন ও কারখানা কর্তৃপক্ষ কী ধরনের কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে সমস্ত মহল। পার্শ্ববর্তী এলাকার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও এই পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখছেন। রাজ্য সরকারের নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই বঞ্চনা কতদিন চলে এবং প্রশাসন এর কী সুরাহা করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। শ্রমিকদের এই আন্দোলনের ফলে এলাকার সার্বিক উৎপাদন প্রক্রিয়াও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা শিল্প মহলেও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। ফলস্বরূপ, শ্রমিক ও মালিক পক্ষের এই দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। সালানপুর এলাকার এই অচলাবস্থা নিরসনে শ্রম দফতরের দ্রুত হস্তক্ষেপে আশাবাদী সাধারণ মানুষ ও শ্রমিক পরিবারগুলি। তবে যতদিন না বাস্তবায়ন হচ্ছে সরকারি নির্দেশ, ততদিন অনড় থাকার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে শ্রমজীবী মানুষ। এই আন্দোলন শুধু দেন্দুয়া বা সালানপুরেই নয়, বরং গোটা আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের অন্যান্য কারখানার শ্রমিকদের মধ্যেও এক নতুন বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। অধিকার আদায়ের এই লড়াইয়ে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ মুখ আজ গোটা শিল্পাঞ্চলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন গোটা পরিস্থিতির ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে যাতে কোনোভাবেই আইন-শৃঙ্খলার অবনতি না ঘটে। তবুও যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে কারখানা চত্বরে।
পশ্চিম বর্ধমান
ন্যূনতম মজুরির দাবিতে দেন্দুয়ায় উত্তাল এলকুইন্ট ও রামদূত স্টিল প্লান্ট, ২৪ ঘণ্টা পেরিয়েও অনড় শ্রমিকেরা

