আসানসোল: বাগেশ্বর ধামের প্রধান এবং স্বঘোষিত ধর্মগুরু পন্ডিত ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী, যিনি 'বাগেশ্বর বাবা' নামেই দেশজুড়ে সমধিক পরিচিত, তাঁর একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে তীব্র অসন্তোষ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এই মন্তব্যের জেরে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, তাঁর এই বক্তব্য বাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি এবং সামগ্রিক বাঙালি সমাজের ভাবাবেগে চরম আঘাত হেনেছে।
এই ঘটনার সূত্রপাত পন্ডিত ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর সম্প্রতি দেওয়া একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে, যা ইতিমধ্যেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে এবং তা নিয়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর আকার ধারণ করে যে, ওয়েস্ট বেঙ্গল প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির বিশিষ্ট সদস্য প্রসেনজিৎ পুইতাণ্ডী সরাসরি স্থানীয় থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। তিনি অবিলম্বে পন্ডিত ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) রুজু করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
থানায় দায়ের করা অভিযোগে প্রসেনজিৎ পুইতাণ্ডী অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন যে, পন্ডিত শাস্ত্রীর ওই কথিত মন্তব্য কেবল আপত্তিকরই নয়, বরং তা বাঙালি সমাজের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, সম্মান এবং মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, বাঙালি সমাজ পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিকাঠামোর একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ, বৈচিত্র্যময় এবং অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কোনো বিশেষ ভাষাগত বা সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়কে হেয় প্রতিপন্ন করে, কিংবা তাদের সম্পর্কে অবমাননাকর বা গতানুগতিক নেতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ার মতো মন্তব্য সামাজিক সম্প্রীতি এবং শান্তি বিঘ্নিত করতে পারে, যা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়।
সংবিধানপ্রদত্ত বাকস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারকে পূর্ণ শ্রদ্ধা জানিয়েও অভিযোগে বলা হয়েছে যে, এই স্বাধীনতার অপব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু বানানো এবং এমন মন্তব্য করা কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, যার ফলে জনশৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে কিংবা সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে পারস্পরিক বিদ্বেষ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তদন্তের স্বার্থে ডিজিটাল ও ইলেকট্রনিক প্রমাণ সংরক্ষণের জোরালো দাবি:
ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ পুইতাণ্ডী পুলিশের কাছে একটি বিশেষ আবেদন জানিয়েছেন। তিনি অনুরোধ করেছেন যে, পন্ডিত ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর ওই বিতর্কিত মন্তব্যের সঙ্গে জড়িত সমস্ত ভিডিও রেকর্ডিং, অডিও ক্লিপ, সোশ্যাল মিডিয়ার বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের পোস্ট, ডিজিটাল বার্তা, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল প্রমাণ অবিলম্বে সংগ্রহ করে সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত করতে হবে। এর পাশাপাশি, অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং এই ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত অন্যান্য ব্যক্তিদের বয়ান রেকর্ড করে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের আর্জি জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে যে, পেশ করা তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে যদি প্রাথমিক তদন্তে কোনো আমলযোগ্য অপরাধ (Cognizable Offence) সংঘটিত হওয়ার প্রমাণ মেলে, তবে আইনের যথাযথ ও কঠোর ধারা অনুযায়ী দ্রুত এফআইআর নথিভুক্ত করে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
ব্যানারে চপলপেটা করে অভিনব প্রতিবাদ:
কেবল আইনি লড়াই বা থানায় অভিযোগ দায়ের করেই ক্ষান্ত থাকেননি কংগ্রেস নেতা প্রসেনজিৎ পুইতাণ্ডী। তিনি এই ঘটনার প্রতিবাদে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ও দৃশ্যমান পন্থার আশ্রয় নেন। আসানসোলে এই ঘটনার প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিক্ষোভ কর্মসূচির সময় তিনি বাগেশ্বর বাবার ছবিযুক্ত একটি ব্যানারে চিল বা চপল মেরে নিজেদের ক্ষোভ উগরে দেন। সেই সঙ্গে পন্ডিত ধীরেন্দ্র শাস্ত্রীর বিরুদ্ধে তীব্র স্লোগান দেওয়া হয় এবং তাঁর শাস্তির দাবি তোলা হয়।
এই বিক্ষোভের সময় প্রসেনজিৎ পুইতাণ্ডী সংবাদমাধ্যমকে বলেন যে, বাঙালি জাতিকে অপমান করার অধিকার কারোর নেই। পুলিশ প্রশাসনের উচিত এই কথিত বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা এবং যদি এই অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়, তবে আইন নিজের পথে চলবে এবং দোষীকে কঠোর সাজা পেতেই হবে।
পুলিশ প্রশাসনের কাছে কঠোর পদক্ষেপ ও শান্তি বজায় রাখার আহ্বান:
অভিযোগপত্রে আরও সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, পন্ডিত শাস্ত্রীর ওই বিতর্কিত মন্তব্য যেভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ ও অসন্তোষের আগুন জ্বলছে, তা নজরে রেখে পুলিশ প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অবিলম্বে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। কোনো অবস্থাতেই যাতে এর জেরে কোনো ধরনের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা বা সামাজিক অশান্তির পরিবেশ তৈরি না হয়, সেদিকে কড়া নজর রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সবশেষে, পুলিশ প্রশাসনের কার্যকারিতা ও সততার ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করে অভিযোগকারী আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই পুরো সংবেদনশীল বিষয়টি কোনো রকম রাজনৈতিক প্রভাব বা পক্ষপাতিত্ব ছাড়াই সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হবে। তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা মেলে, তবে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোরতম আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে বলেই তাঁর বিশ্বাস। তবে এই পুরো ঘটনার চূড়ান্ত আইনি পরিণতি কী হবে, তা নির্ভর করছে পুলিশের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট বিচারবিভাগীয় ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের সিদ্ধান্তের ওপর।
পশ্চিম বর্ধমান
বাঙালিকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য! বাগেশ্বর বাবার বিরুদ্ধে আসানসোলে থানায় এফআইআর কংগ্রেস নেতার

বাগেশ্বর সরকারের বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে এফআইআর দায়ের কংগ্রেস নেতার, পোস্টারে চপ্পল মেরে প্রকাশ করলেন ক্ষোভ।|Nirbhik Bangla Photo
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
