রানীগঞ্জের জেকে নগর কোলিয়ারি লাগোয়া বালকো কোম্পানির আবাসনে ৫৫ বছরের এক একা বসবাসকারী মহিলার নৃশংস খুনকে কেন্দ্র করে পুরো আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে চরম চাঞ্চল্য ও ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। কয়লা উত্তোলনের জন্য পরিচিত এই সুরক্ষিত ও আধা-শহুরে জনপদে এই মাত্রার বর্বরতা অতীতে কখনও দেখা যায়নি বলেই দাবি করেছেন স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তে একে একটি সুপরিকল্পিত খুন হিসেবে চিহ্নিত করলেও, নিহতের পরিবারের সদস্যদের বিস্ফোরক অভিযোগ পুরো ঘটনাটিকে এক নতুন মোড় দিয়েছে। ঘটনার তীব্রতা উপলব্ধি করে আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের শীর্ষ আধিকারিকরা রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং ফরেনসিক ও গোয়েন্দা দল যৌথভাবে তদন্ত শুরু করেছে যাতে দ্রুত অপরাধীদের নাগাল পাওয়া যায়।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই মহিলা জেকে নগর কোলিয়ারি এলাকার একটি কোয়ার্টারে দীর্ঘ ১ दशक এর বেশি সময় ধরে একা বসবাস করতেন। তাঁর এই একা থাকার সুযোগ নিয়েই কোনো দুষ্কৃতী চক্র এই জঘন্য কাণ্ড ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে। মৃতার মেয়ে অপর্ণা ভিডিও বার্তায় কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান, জেকে নগরের ইতিহাসে এত জঘন্য ও নৃশংস অপরাধ কখনও ঘটেনি। ৫৫ বছরের এক মহিলার ওপর যে ধরনের পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা যেকোনো সভ্য সমাজের কাছে লজ্জাজনক ও কল্পনাতীত। তাঁর জোরালো অভিযোগ, মাথায় ভারী লোহার রড বা এই জাতীয় কোনো ভোঁতা অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে খুন করার পাশাপাশি মৃত্যুর আগে শারীরিক নির্যাতনও চালানো হয়েছে। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে এলেই মৃত্যুর আসল কারণ এবং নির্যাতনের বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে।
এই খুনের নেপথ্যে কি তবে রিয়েল এস্টেট বা জবরদখলের কোনো যোগ রয়েছে? শিল্পাঞ্চলের এই আবাসনগুলিতে এই প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিহতের মেয়ের দাবি, তাঁদের কোয়ার্টারটি মূল রাস্তার ধারে অত্যন্ত ভালো একটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক অবস্থানে ছিল। দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি বা অসামাজিক উপাদান ওই জায়গাটি ছাড়ার জন্য নানাবিধ চাপ দিচ্ছিল। কখনও দোকান করার জন্য, কখনও ঘর ভাড়া দেওয়ার জন্য, আবার কখনও রাজনৈতিক দলীয় অফিস তৈরির উছিলায় কোয়ার্টারটি খালি করার জন্য লাগাতার হুমকি দেওয়া হতো। কিন্তু মৃত মহিলা অত্যন্ত সাহসী ছিলেন এবং সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, এটি তাঁর শেষ বয়সের মাথা গোঁজার ঠাঁই এবং তিনি কোনোভাবেই তা ছাড়বেন না। মৃতার ছেলেরও একই দাবি, মায়ের সঙ্গে এলাকার কারও কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা বা আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত বিবাদ ছিল না। ঘটনার রাতেও মায়ের সঙ্গে তাঁর ফোনে স্বাভাবিক কথাবার্তা হয়েছিল। ফলে জমি বা কোয়ার্টার দখল সংক্রান্ত কোনো পুরনো ক্ষোভ ও হুমকি থেকেই এই পূর্বপরিকল্পিত খুন কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
ঘটনার তীব্রতা ও সংবেদনশীলতা বিচার করে সোমবার রাতেই ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের কমিশনার ডাঃ প্রণব কুমার। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ডিসিপি সেন্ট্রাল ধ্রুব দাস, এসিপি সেন্ট্রাল টু বিমান কুমার মৃধা, রানীগঞ্জ থানার ইন্সপেক্টর পার্থ ঘোষ ও নিমচা ফাঁড়ির আইসি নাসরিন সুলতানা সহ এক বিশাল পুলিশ বাহিনী। পুরো এলাকা পুলিশি পাহারায় কর্ডন করে রেখে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ দল ঘর থেকে বিভিন্ন আঙুলের ছাপ ও অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করে। পুলিশ কমিশনার নিজে গোটা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেন এবং স্থানীয় থানা ও গোয়েন্দা বিভাগকে সমন্বয় করে দ্রুত অপরাধীদের পাকড়াও করার কড়া নির্দেশ দেন।
পরিবারের পক্ষ থেকে এই মর্মান্তিক ঘটনার কঠোরতম তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পাড়া-প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও সতর্ক ও সহযোগিতাপূর্ণ হওয়ার আবেদন করেছেন তাঁরা। অপর্ণা আক্ষেপের সুরে জানান, এই ঘটনা শুধুমাত্র তাঁদের পরিবারের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং গোটা সমাজের প্রবীণ ও একা থাকা নাগরিকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক চরম হুঁশিয়ারি। তিনি রাজ্যের মহিলা ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালসহ সকল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে এই ঘটনায় দ্রুত ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার আকুল আর্্তি জানিয়েছেন। সেই সঙ্গে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় না আনা হলে বৃহত্তর আন্দোলনেরও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
কয়লাঞ্চল ও শিল্পাঞ্চলে একা বসবাসকারী নারী এবং প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিয়ে এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড ফের একবার বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে। পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল সমস্ত দিক—ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমি সংক্রান্ত জবরদখলের চেষ্টা, নাকি কোনো পেশাদার অপরাধী চক্রের ছিনতাই ও লুটপাটের উদ্দেশ্য—খতিয়ে দেখছে। জেকে নগরের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড এখন গোটা আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলের মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক, বেদনা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
অপরাধ
রানীগঞ্জের জেকে নগরে প্রবীণ মহিলাকে নৃশংস খুন, আতঙ্কে পুরো আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চল

Nirbhik Bangla Photo
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
