দুর্গাপূজা মানেই আনন্দ, উল্লাস এবং শারদোৎসাবের পসরা। তবে এই উৎসবকে সম্পূর্ণ নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আসানসোলের রবীন্দ্র ভবন প্রেক্ষাগৃহে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হলো। আসন্ন দুর্গাপূজা যাতে সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে, তার জন্য রাজ্য সরকারের নির্দেশিকা এবং প্রশাসনের বিভিন্ন নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলার কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে এই বৈঠকে। আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের উদ্যোগে আয়োজিত এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, জনপ্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকরা।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আসানসোল উত্তরের বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখার্জি, বিধায়ক অরিজিত রায়, বিধায়ক বিজন মুখার্জি, পুলিশ কমিশনার প্রণব কুমার, পশ্চিম বর্ধমান জেলার জেলাশাসক এস. পন্নাবলম, আসানসোল পৌরনিগমের কমিশনার দিলীপ মিশ্র সহ দমকল বিভাগ, বিদ্যুৎ পর্ষদ এবং পুলিশের বিভিন্ন স্তরের পদস্থ আধিকারিকরা। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, উৎসবের দিনগুলিতে সাধারণ মানুষের সুরক্ষা এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করাই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।
'সেফ পূজা' বা নিরাপদ উৎসব পালনের ওপর বিশেষ জোর দিয়ে জেলাশাসক এস. পন্নাবলম জানান যে, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় রেখেই এই নির্দেশিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। পুলিশ প্রশাসন, পৌরনিগম, স্বাস্থ্য বিভাগ (CMOH), দমকল এবং বিদ্যুৎ দপ্তরের (WBSEDCL) পক্ষ থেকে পূজাকমিটিগুলিকে তাদের নিজ নিজ এলাকার প্রস্তুতি ও নিয়মাবলী সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন থানা স্তরে যে সমস্ত প্রাক-প্রস্তুতি বৈঠক হয়েছিল, সেখানে পুজো কমিটিগুলির তরফ থেকে বেশ কিছু গঠনমূলক প্রস্তাব ও সমস্যা তুলে ধরা হয়েছিল। বিশেষ করে রাস্তাঘাট পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা এবং আলোর ব্যবস্থার মতো সাধারণ কিছু দাবি জানানো হয়েছে। জেলাশাসক আশ্বাস দিয়েছেন যে, নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে থেকে আবেদনপত্র বিচার করে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
আইন-শৃঙ্খলা এবং জনজীবনের সুরক্ষার কথা মাথায় রেখে এ বছর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেমন, দুর্গাপূজার সময় ডিজে (DJ) সাউন্ড সিস্টেম বাজানোর উপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি, গত কয়েক বছরের প্রথা ভেঙে এ বছর কোনো কার্নিভালের আয়োজন করা হচ্ছে না। পূজাকমিটিগুলিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে প্রতিটি মণ্ডপে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা বা ফায়ার সেফটি নিশ্চিত করতে হবে। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে মণ্ডপের আশেপাশে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন রাখতে হবে এবং কোনো অবস্থাতেই যাতে প্যান্ডেলের সামনে যানজট সৃষ্টি না হয়, সেদিকে ট্রাফিক পুলিশ ও কমিটির স্বেচ্ছাসেবকদের নজর রাখতে হবে। রাতের বেলা মণ্ডপগুলিতে যাতে পর্যাপ্ত সংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক উপস্থিত থাকেন, সেই বিষয়টিও নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
প্রতিমা বিসর্জনের সময় নিরাপত্তা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলাশাসক জানান যে সমস্ত স্থানে একসঙ্গে প্রচুর প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়, সেখানে ক্রেনের পরিবর্তে আধুনিক ট্রলি সিস্টেম বা অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থা চালুর চিন্তাভাবনা চলছে। পৌরনিগমের পক্ষ থেকে বিসর্জন ঘাটগুলির জন্য একটি বিশেষ পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হলো বিসর্জনের পরপরই সংশ্লিষ্ট ঘাট এবং জলাশয়গুলির পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, যাতে নদী বা জলাশয়ের জল দূষিত না হয় এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।
আসানসোলের বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখার্জি পুলিশ কমিশনার ও জেলাশাসকের সঙ্গে হওয়া এই সমন্বয় বৈঠককে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, প্রত্যেকটি পুজো কমিিতকে সংবিধান এবং আইনের সীমার মধ্যে থেকেই উৎসব উদযাপন করতে হবে এবং এক্ষেত্রে প্রশাসনের তরফ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। নতুন পুজো কমিটিগুলিকে নিয়ম মেনে অনুমতি দেওয়ার বিষয়েও প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। অতীতে বিসর্জনের সময় কিছু কিছু স্থানে পুলিশের সঙ্গে অসদাচরণ বা মারধরের মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল, যা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না বলে তিনি সতর্ক করে দেন। তিনি জানান, বিসর্জনের শোভাযাত্রার সময় কোনো ব্যক্তি যাতে মদ্যপ অবস্থায় না থাকে, সেই দায়িত্ব পুজো কমিটিকেই নিতে হবে।
এছাড়াও, পূজার দিনগুলিতে প্যান্ডেল বা জনবহুল এলাকায় চেইন বা মোবাইল স্নাচিংয়ের মতো অপরাধমূলক ঘটনা প্রতিরোধে পুলিশি নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পার্কিংয়ের নামে যাতে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অতিরিক্ত বা অবৈধ অর্থ আদায় না করা হয়, সেদিকেও কড়া নজর রাখতে বলা হয়েছে। গত বছর কুলটি এলাকায় পার্কিং নিয়ে যে অনভিপ্রেত গন্ডগোল হয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি যাতে এ বছর না ঘটে, সে বিষয়ে পুজো কমিটিগুলিকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সবমিলিয়ে, নির্ধারিত সময়সীমা এবং সুনির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশিকা মেনে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পুলিশ, প্রশাসন, পৌরনিগম এবং পুজো কমিটিগুলির পারস্পরিক সহযোগিতায় এবারের দুর্গাপূজা আসানসোলে অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ ও আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপিত হবে বলেই আশা প্রকাশ করেছেন প্রশাসনিক কর্তারা।
বিনোদন
দুর্গাপূজায় ডিজে-তে নিষেধাজ্ঞা, বন্ধ কার্নিভাল: আসানসোলে শান্তিশৃঙ্খলায় কড়া নির্দেশিকা প্রশাসনের

Nirbhik Bangla Photo
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
