মহিলা নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার কৌশল অর্জনের লক্ষ্যে শিল্পাঞ্চল আসানসোলে এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আসানসোল উত্তর বিধানসভা এলাকার তরুণী ও মহিলাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে শুরু হয়েছে ১০ দিনের বিশেষ 'কলরিপায়ট্টু' প্রশিক্ষণ শিবির। ভারতের প্রাচীনতম এই মার্শাল আর্টের মাধ্যমে নারীদের ক্ষমতায়ন ও সুরক্ষা সুনিশ্চিত করাই এই কর্মশালার মূল লক্ষ্য। আসানসোল উত্তর বিধানসভার বিধায়ক তথা 'আসানসোল স্পোর্টস লাভার্স অ্যাসোসিয়েশন'-এর সভাপতি কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ উদ্যোগ ও সহযোগিতায় আয়োজিত এই শিবিরকে কেন্দ্র করে সমগ্র আসানসোল শিল্পাঞ্চলে ব্যাপক উদ্দীপনা ও উৎসাহের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই নিবিড় প্রশিক্ষণ শিবিরটি চলবে আগামী ১০ অক্টোবর পর্যন্ত। আসানসোলে আয়োজিত এই শিবিরে কেবল পশ্চিমবঙ্গ থেকেই নয়, দেশের অন্যান্য রাজ্য থেকেও বহু শিক্ষার্থী ও ক্রীড়াপ্রেমী অংশ নিয়েছেন। প্রশিক্ষণের মান আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করতে সুদূর কেরল থেকে নিয়ে আসা হয়েছে অভিজ্ঞ কলরিপায়ট্টু গুরু ও দক্ষ প্রশিক্ষকদের। তাঁরাই নিপুণ হাতে অংশগ্রহণকারীদের ভারতের এই প্রাচীন যুদ্ধকলার নানা সূক্ষ্ম কৌশল শেখাচ্ছেন।
এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি উপলক্ষে আয়োজকদের পক্ষ থেকে আসানসোলে একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে ভারতীয় ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধকলা কলরিপায়ট্টুর ইতিহাস, এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এবং বর্তমান যুগে মহিলাদের আত্মরক্ষার ক্ষেত্রে এর অপরিসীম গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
কী এই কলরিপায়ট্টু এবং কেন এটি অনন্য?
সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত কেরল থেকে আসা বিশিষ্ট কলরিপায়ট্টু প্রশিক্ষক অনিল কুমার জানান, তিনি 'মাথরি মর্ম চিকিৎসা কলরি সেন্টার' (MMC Kalari)-এর প্রতিনিধিত্ব করছেন। কলরিপায়ট্টু শব্দটির উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, 'কলরি' অর্থ অনুশীলনের স্থান বা আখড়া এবং 'পায়ট্টু' মানে যুদ্ধ বা লড়াইয়ের কৌশল। অর্থাৎ, যে বিশেষ স্থানে যুদ্ধের কৌশল বা আত্মরক্ষা অনুশীলন করা হয়, তাকেই কলরিপায়ট্টু বলা হয়।
অনিল কুমার আরও বলেন, প্রায় চার হাজার বছরের পুরনো এই শিল্পকে বিশ্বের সমস্ত আধুনিক মার্শাল আর্টের 'জননী' বলে গণ্য করা হয়। এর দুটি প্রধান শৈলী রয়েছে—উত্তরী শৈলী এবং দক্ষিণী শৈলী। পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক মতানুসারে, উত্তরী শৈলীর প্রবর্তক ভগবান পরশুরাম এবং দক্ষিণী শৈলীর প্রবর্তক ঋষি অগস্ত্য। দক্ষিণ ভারতে এটি অঞ্চলভেদে বর্ম বিদ্যা, অডিমুরাই, সিলাম্বম এবং মর্মকলাই নামে পরিচিত। এই যুদ্ধকলা কেবল শারীরিক শক্তির প্রয়োগ শেখায় না, বরং শরীরের 'মর্মস্থান' (Vital points) সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়, যার মাধ্যমে সামান্যতম শক্তি প্রয়োগ করেও আত্মরক্ষা সম্ভব। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের গণ্ডি পেরিয়ে আজ বিশ্বজুড়ে এই শিল্প সমাদৃত হচ্ছে।
কেরলের বিশেষজ্ঞ দল আসানসোলে
শিবিরে প্রশিক্ষণ দিতে কেরল থেকে আসানসোলে এসেছে একদল অত্যন্ত দক্ষ প্রশিক্ষক। এই দলে রয়েছেন বৈশাখ, বিষ্ণু, আপ্পু, বৈশাখ লক্ষ্মী, সান্দ্রা এবং অক্ষয়ার মতো আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্তরে অভিজ্ঞ অ্যাথলেটরা। পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধি হিসেবে স্নিগ্ধাও এই কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। দক্ষ এই দল প্রশিক্ষণার্থীদের ধাপে ধাপে শারীরিক নমনীয়তা, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং আত্মরক্ষার কৌশল শেখাচ্ছেন।
মহিলা ক্ষমতায়ন ও আত্মরক্ষায় নতুন বার্তা
অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা কমিটির প্রতিনিধি ঐরিশ মুখোপাধ্যায় জানান, সাম্প্রতিককালে সমাজে মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মূল ভাবনাই হলো, সমাজের প্রতিটি মহিলা যেন নিজের সুরক্ষা নিজেই সুনিশ্চিত করতে পারেন। তিনি কেবল শারীরিক আত্মরক্ষার কৌশল শেখাচ্ছেন না, বরং তাঁদের মধ্যকার ভয় দূর করে মানসিক আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলছেন।
ঐরিশ মুখোপাধ্যায় আরও মনে করিয়ে দেন যে, আসানসোল স্পোর্টস লাভার্স অ্যাসোসিয়েশন দীর্ঘদিন ধরে খেলাধুলার মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিপূর্বে তারা সফলভাবে 'প্রগতি কাপ' মহিলা ফুটবল টুর্নামেন্টের আয়োজন করেছিল, যা এলাকায় ব্যাপক প্রশংসিত হয়। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এবার এই প্রাচীন ভারতীয় যুদ্ধকলা প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন।
আত্মবিশ্বাস বাড়ায় কলরিপায়ট্টু: স্নিগ্ধা
প্রশিক্ষক দলের সদস্য স্নিগ্ধা জানান, কলরিপায়ট্টু অনুশীলনের মাধ্যমে একজন মানুষের একাগ্রতা, শারীরিক ভারসাম্য, সহনশীলতা ও আত্মবিশ্বাস কয়েক গুণ বেড়ে যায়। বিপদের মুহূর্তে একজন নারী কীভাবে শান্ত থেকে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে পারেন, তা কলরি অনুশীলনের মাধ্যমে সহজে আয়ত্ত করা সম্ভব।
১০ অক্টোবর গ্র্যান্ড শো ও বিশেষ প্রদর্শনী
আয়োজকরা জানিয়েছেন, ১০ দিনের এই কঠোর প্রশিক্ষণের সমাপ্তি ঘটবে আগামী ১০ অক্টোবর একটি জমকালো প্রদর্শনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। সেদিন শিবিরের তরুণী ও মহিলারা তাঁদের অর্জিত দক্ষতা, মার্শাল আর্টের কৌশল ও বিভিন্ন আত্মরক্ষামূলক পারফর্ম্যান্স সর্বসমক্ষে প্রদর্শন করবেন।
উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে আসানসোলের সমস্ত বাসিন্দাকে আগামী ১০ অক্টোবরের বিশেষ প্রদর্শনীতে উপস্থিত থাকার জন্য সাদর আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাঁদের বার্তা—কলরিপায়ট্টু কেবল যুদ্ধকলা নয়, এটি শৃঙ্খলা, সুস্থ জীবনযাত্রা ও আত্মবিশ্বাসের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। শিল্পাঞ্চলের নারীশক্তিকে জাগ্রত করতে এই প্রশিক্ষণ শিবির এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।
আসানসোল
মহিলা সুরক্ষায় আসানসোলে শুরু হলো প্রাচীন মার্শাল আর্ট কলরিপায়ট্টুর ১০ দিনের বিশেষ শিবির

Nirbhik Bangla Photo
ট্যাগসমূহ:Nirbhikbangla
